খেজুরের উপকারিতা

বন্ধুরা আমাদের সমাজে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে মিষ্টি খাবার মানেই তা শরীরের জন্য ভালো নয় বা মিষ্টি কম খাওয়া উচিত, যদিও কথা টা খুউব যে অসত্য তা কিন্তু নয়। তবে এই ধারণা সব কিছুর ক্ষেত্রে কিন্তু ঠিক নয়। কারণ খেজুর একটা মিষ্টি ফল, তবু এর মধ্য কোনও ক্ষতিকর উপাদান নেই। বরং এটি খেলে শরীর অনেক চাঙ্গা থাকে। খেজুরের মধ্য বিপুল পরিমাণে ভিটামিন, মিনারেল, ক্য়ালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম এবং ফাইবার থাকার কারণে শীতকালে এই ফলটি খাওয়া খুব জরুরি। তবে আমি বলবো যে শীতকালে তো খাবেনই তা ছাড়া অন্য যে কোনো সময়ে আপনি খেতেই পারেন কোনো সমস্যা নেই। চলে যাবো আবার খেজুরের উপকারিতা নিয়ে আলোচনা পর্বে। 

খেজুরের যত উপকারিতা-অপকারিতা

খেজুর সকলেই চিনি এবং পছন্দও করি৷ তবে এতে যে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কত উপাদান রয়েছে, তা হয়ত আপনাদের জানা নেই৷ খেজুরের এতসব গুণের কারণে এই মিষ্টি ও রসালো ফল খাওয়ায় আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে৷ তবে খেজুরের অনেক উপকারিতার মধ্যে রয়েছে কিছুটা অপকারিতা।

রোজার সময় খেজুর ছাড়া ইফতার করার কথা যেন ভাবাই যায় না৷ খেজুর খেতে মিষ্টি এবং এতে রয়েছে প্রচুর ক্যালোরি এ কথা ঠিক৷ তবে এতে রয়েছে প্রচুর খাদ্যগুণ, যেমন ভিটামিন ‘বি’, ‘সি’ আয়রন এবং প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম যা হৃদপিণ্ড এবং রক্তচাপের জন্য খুবই উপকারী৷ আরো রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম, অ্যামিনো অ্যাসিড৷ তাছাড়াও ট্রিপটোফেন-মেলাটনিন হরমোন যা, ভালো ঘুম হতে সহায়তা করে ৷

খেজুর মুহূর্তেই শরীরে শক্তি দেয়

শুকনো খেজুরের ওজনের শতকরা ৮০ ভাগই চিনি এবং সে কারণেই সরাসরি রক্তে চলে যায়৷ আর সে কারণেই শুকনো খেজুরকে মরুভূমির গ্লুকোজ বলা হয়ে থাকে ৷

স্ট্রেস দূর করে

স্ট্রেস ও নার্ভাসনেসের কারণে মাথা ব্যথা হলে তা সহজেই দূর করতে পারে খেজুর  ৷ খেজুরে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস ও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, যা স্ট্রেস দূর করতে সহায়ক৷

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে খেজুর

মানসিক চাপ, রাগ বা অন্য অনেক কারণেই হঠাৎ করে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়৷ আবার এর সঙ্গে পেট ব্যথাও হয়ে থাকে অনেক সময়৷ এরকম পরস্থিতিতে শুকনো খেজুর খেলে খুব সহজে পেট পরিষ্কার হতে পারে৷ তবে সাথে প্রচুর জল  পান করতে হবে৷ একমাত্র তবেই সঠিক ফল পাওয়া সম্ভব৷

খেজুর যেভাবে রাখবেন

তাজা খেজুর সরাসরি ফ্রিজে রাখা ভালো এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তা খেয়ে ফেলা উচিত ৷ তবে শুকনো খেজুর বা খোরমা কিছুদিন রেখে খাওয়া যায় ৷ তবে লক্ষ্য রাখতে হবে তাতে যেন পোকা বা ফাঙ্গাস না হয়৷ এরকমটা হলে খেজুর সাথে সাথেই ফেলে দেওয়া উচিত৷

খেজুরের ঔষধি গুণাগুণ

মরুঅঞ্চলের ফল খেজুর। পুষ্টিমানে যেমন এটি সমৃদ্ধ, তেমনি এর রয়েছে অসাধারণ কিছু ঔষধিগুণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয়েছে, সারা বছর খেজুর খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। এছাড়া, এই ফলটিতে রয়েছে প্রাণঘাতী রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা। চলুন জেনে নেই খেজুরের কিছু ঔষধি গুণাগুণ।

1. রুচি বাড়াতে খেজুরের কোন তুলনা হয় না। অনেক শিশুরা তেমন একটা খেতে চায় না, তাদেরকে নিয়মিত খেজুর . খেতে দিলে রুচি ফিরে আসবে।

2. তুলনামূলকভাবে শক্ত খেজুরকে জলে ভিজিয়ে (সারা রাত) সেই জল খালি পেটে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। তাজা খেজুর নরম এবং মাংসল যা সহজেই হজম হয়।

3. হৃদপিণ্ডের সমস্যা দূর করতে প্রতিদিন খেজুর খাওয়া অত্যন্ত জরুরী। গবেষণায় দেখা যায়, পুরোরাত খেজুর জলে ভিজিয়ে সকালে পিষে খাওয়ার অভ্যাস হার্টের রোগীর সুস্থতায় কাজ করে।

4. ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এই ফল দৃষ্টিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খেজুরে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল বিদ্যমান থাকায় অনেক রোগ নিরাময় করা সম্ভব। সাথে সাথে আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সহায়তা করে।

5. খুব দুর্বল লাগছে অথবা দেহে এনার্জির অভাব হচ্ছে? তাহলে ঝটপট খেয়ে নিন খেজুর। তাৎক্ষণিকভাবে দেহে এনার্জি সরবরাহের ক্ষেত্রে খেজুরের তুলনা নেই।

6. খেজুর বিভিন্ন ক্যান্সার থেকে শরীরকে সুস্থ রাখতে অনেক ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন খেজুর লাংস ও ক্যাভিটি ক্যান্সার থেকে শরীরকে দূরে রাখতে সাহায্য করে।

7. খেজুরের মধ্যে রয়েছে স্যলুবল এবং ইনস্যলুবল ফাইবার ও বিভিন্ন ধরণের অ্যামিনো অ্যাসিড যা সহজে খাবার হজমে সহায়তা করে। এতে করে খাবার হজম সংক্রান্ত সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

8. খেজুরে আছে ডায়েটরই ফাইবার যা কলেস্টোরল থেকে মুক্তি দেয়। ফলে ওজন বেশি বাড়ে না, সঠিক ওজনে দেহকে সুন্দর রাখা যায়। ৯. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। পক্ষঘাত এবং সব ধরনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশকারী রোগের জন্য খেজুর খুবই উপকারী।

9. খেজুরের চূর্ণ মাজন হিসেবে ব্যবহার করলে দাঁত পরিষ্কার হয়।

10. খেজুরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। প্রতিদিন খেজুর খাওয়ার অভ্যাস দেহের আয়রনের অভাব পূরণ করে এবং রক্তস্বল্পতা রোগের হাত থেকে রক্ষা করে। যাদের এই রক্তস্বল্পতার সমস্যা রয়েছে তাদের প্রতিদিন খেজুর খাওর অভ্যাস করা উচিত। কারণ, রক্তস্বল্পতা ও শরীরের ক্ষয়রোধ করতে খেজুরের রয়েছে বিশেষ গুণ।

প্রতিদিন সকালে খেজুর খাওয়ার উপকারিতা

গত প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে নানা উপকারে লাগলেও আজও স্বাস্থ্য সচেতনদের পছন্দের লিস্টে জায়গা করে উঠতে পারেনি ছোট্ট এই ফলটি। সুস্বাদু এই মরু ফলটির শরীরে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ফাইবার, খনিজ এবং ভিটামিন । প্রতিদিন সকালে ৩-৪ টে খেজুর খেলে দারুণ উপকার পাওয়া যায়। বিশেষত যারা কনস্টিপেশন বা কোনো ধরনের পেটের রোগে ভুগছেন তাদের জন্য তো এই ফলটি মহৌষধির কম নয়! এখানেই শেষ নয়, খেজুরের আরও অনেক উপকারিতা আছে, যেমন – একাধিক পেটের রোগের প্রকোপ কমায়।  প্রচুর পরিমাণ ফাইবার থাকার কারণে নিয়মিত এই ফলটি খেলে বাওয়েল মুভমেন্টে মারাত্মক উন্নতি ঘটে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কোনো ধরনের পেটের রোগই আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না। প্রসঙ্গত, একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন ৩টি করে খেজুর খেলে শরীরে অন্দরে উপকারী ব্যাকটেরিয়ায় মাত্রা বৃদ্ধি পায়। ফলে বদহজম, কোলাইটিস ও হেমোরয়েডের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা হ্রাস পায়।

হাড়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে

খেজুরে উপস্থিত খনিজ এবং ভিটামিন হাড়কে এতটাই শক্তপোক্ত করে দেয় যে বয়স্কালে অস্টিও পোরোসিসের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কমে যায়। অ্যানিমিয়া রোগকে দূরে রাখে শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলেই মূলত এই ধরনের রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। তাই তো শরীরে যাতে এই খনিজটির ঘাটতি কোনও সময় দেখা না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন। আর এক্ষেত্রে খেজুর দারুণভাবে সাহায্য করতে পারে। কীভাবে? এই ছোট্ট ফলটি আয়রণ সমৃদ্ধি। তাই তো অ্যানিমিয়ার মতো রোগকে দূরে রাখতে বিশেষ ভুমিকা নেয়।

অ্যালার্জির প্রকোপ কমায়

২০০২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে দাবি করা হয়েছিল খেজুরে উপস্থিত সালফার কম্পাউন্ড অ্যালার্জির মতো রোগ থেকে দূরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে

ডায়াটারি ফাইবারে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে নিয়মিত খেজুর খেলে শরীরে ‘এল ডি এল’ বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে শুরু করে। ফলে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের আশঙ্কা হ্রাস পায়। সেই সঙ্গে এতে উপস্থিত পটাশিয়াম আরও সব হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমায়।

ওজন বাড়ায়

নানা কারণে যাদের ওজন মাত্রাতিরিক্ত হারে কমে যেতে শুরু করেছে, তারা আজ থেকেই খেজুর খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন উপকার পাবেন। কারণ এই ফলটিতে উপস্থিত ক্যালরি শরীরে ভাঙন রোধ করে ওজন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

সংক্রমণের আশঙ্কা হ্রাস

খেজুরে প্রচুর মাত্রায় প্রাকৃতির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা একাধিক রোগকে দূরে রাখার পাশাপাশি শরীরের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এখানেই শেষ নয়, এই ফলটিতে বেশ কিছু অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল প্রপাটিজও রযেছে, ফলে নিয়মিত খেজুর খেলে সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও অনেকাংশে হ্রাস পায়।

শেষ কথা 

যাদের মাইগ্রেন বা প্রচণ্ড মাথা ব্যথার সমস্যা রয়েছে, তাদের খেজুর না খাওয়াই ভালো৷ কারণ ছোট মিষ্টি খেজুরে ‘টিরামিন’ বলে যে পদার্থটি রয়েছে, তা মাথা ব্যথা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে৷ তাছাড়া আর যারা ডিপ্রেশনে ভুগছেন, তাদের জন্যও খেজুর খাওয়া ঠিক নয়৷ এক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে ৷ ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

Comments are closed.