থাইরয়েড সমস্যা সমাধান,কারণ ও করণীয়

নমস্কার বন্ধুরা আমি শান্তনু আপনাদের সবাইকে আমার এই chalokolkata.com এ স্বাগতম। আশা করি সবাই আপনারা ভালোই আছেন আর  সুস্থ আছেন। বন্ধুরা আজ আমি আপনাদের থাইরয়েডের সমস্যা কারন এবং করণীয় এই ব্যাপারে জানাবো। এর আগেও অনেক লেখা আছে আমাদের ব্লগ এ।

থাইরয়েড আসলে কী

এটি একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি। এটি থেকে টি থ্রি এবং টি ফোর নামে দু’টি হরমোন ক্ষরণ হয়। শরীরের মেটাবলিজ়মকে নিয়ন্ত্রণ করা এর কাজ। এই হরমোনের নিঃসরণের হার কম-বেশি হলেই নানা সমস্যা দেখা যায়।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো হল-

1. হাইপোথাইরয়েডিজম বা অপর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণ। ভারতীয় পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে থাইরয়েডের সমস্যার মধ্যে এটা প্রায়শই দেখা দেয়।

2. হাইপারথাইরয়েডিজম বা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণ থাইরয়েড হরমোনের নিঃসরণ।

3. থাইরয়েড ক্যানসার।

4. গয়টার বা গলগন্ড (থাইরয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়া)।

এগুলোর মধ্যে থাইরয়েড হরমোন নিঃসরণের ভারসাম্যহীনতাজনিত সমস্যা (হাইপারথাইরয়েডিজম এবং হাইপোথাইপোথাইরয়েডিজম) অধিকাংশ সময়ে বিশেষত মহিলাদের মধ্যেই দেখা দেয়।

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে মানুষ মানসিক দিক থেকে খুব বিষণ্ণ থাকে। এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা যেমন- অবসাদ ও উদ্বেগের মিল রয়েছে। তাই যেকোনও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা নির্ধারণের সময়ে প্রথমে থাইরয়েডের সমস্যার বিষয়ে জেনে নেওয়া জরুরি।

সমস্যার ধরন

থাইরয়েডের কার্যকারণজনিত সমস্যা দু’রকমের— হাইপোথাইরয়েডিজ়ম ও হাইপারথাইরয়েডিজ়ম। থাইরয়েডের ভারসাম্যহীনতার উৎপত্তি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অটোইমিউনজনিত কারণ। আবার এর গঠনগত সমস্যাও হতে পারে, যেখানে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড ফুলে যায়, অথচ হরমোনের ক্ষরণ ঠিকঠাক হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, গঠনগত সমস্যার মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক ক্ষেত্রেই থাইরয়েড ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

হাইপোথাইরয়েডিজম

পর্যাপ্ত পরিমাণ হরমোন যদি গ্ল্যান্ড থেকে উৎপন্ন না হয়ে শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্মের ব্যাঘাত সৃষ্টি করে, তাকে হাইপোথাইরয়েডিজ়ম বলে। হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, মানসিক অবসাদ, ক্লান্তিবোধ, গলার স্বর ভারী হওয়া, ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব বোধ, পা ফোলা, রুক্ষ ত্বক, চুল পড়া, কোষ্ঠকাঠিন্য এর প্রধান লক্ষণ। তবে লক্ষণগুলো থাইরয়েডের জন্যই কি না, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে সময় লেগে যায়। আবার পরিবারে কারও থাইরয়েডজনিত অসুখ থাকলেও থাইরয়েড হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অনিয়মিত ঋতুস্রাব, গর্ভধারণের সমস্যার পিছনেও হরমোন দায়ী। যে কোনও বয়সের পুরুষ বা মহিলারই হাইপোথাইরয়েডিজ়ম হতে পারে।

সদ্যোজাত শিশুর থাইরয়েড গ্ল্যান্ড তৈরি না হলে আবার কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজ়ম দেখা যায়। ঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না হলে শিশুর বুদ্ধির স্বাভাবিক বিকাশ হয় না। চিকিৎসা পরিভাষায় একে ক্রেটিনিজ়ম বলা হয়। অনেক সময় আবার বাচ্চাদের পরিপূর্ণ শারীরিক বিকাশ না হওয়ার পিছনেও হাইপোথাইরয়েডিজ়ম দায়ী হয়।

হাইপারথাইরয়েডিজম

হাইপারথাইরয়েডিজ়ম হওয়ার কারণটা ঠিক উলটো। থাইরয়েড গ্ল্যান্ড থেকে অতিরিক্ত হরমোন উৎপন্ন হয়ে শরীরের স্বাভাবিক কাজে বাধা সৃষ্টি করে। বুক ধড়ফড় করা, অল্পে হাঁপিয়ে ওঠা, ওজন কমে যাওয়া, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসা, হাত-পা কাঁপা, অতিরিক্ত গরম লাগা, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া এর লক্ষণ।

চিকিৎসা

হাইপো বা হাইপার— দু’ক্ষেত্রেই নিয়মিত ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা সম্ভব। হাইপারথাইরয়েডিজ়মের ক্ষেত্রে ওষুধে কাজ না করলে সার্জারি বা রেডিয়ো অ্যাক্টিভ আয়োডিনথেরাপি করা হয়। এর হাত থেকে রক্ষার প্রধান উপায়ই হল লক্ষণ বুঝে, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো রক্ত পরীক্ষা। সাধারণত হাইপোথাইরয়েডিজ়মে টি থ্রি এবং টি ফোর কম হলে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোনের (টিএসএইচ) মাত্রা বেড়ে যায়। হাইপারে উলটো হয়। রক্তে টি থ্রি ও টি ফোরের মাত্রা বেড়ে যায় ও হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম হয়। হাইপোথাইরয়েডিজ়মে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো সকালে খালি পেটে ওষুধ খাওয়া ভাল। ওষুধ খাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে চা-কফি বা খাবার চলবে না। রক্ত পরীক্ষা না করিয়ে ওষুধের ডোজ় বদলানো উচিত নয়। প্রাথমিক ভাবে তিন মাস, তার পর ছ’মাস অন্তর রক্ত পরীক্ষা করানো জরুরি। তবে হাইপারের সমস্যায় ঘন ঘন রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

থাইরয়েড ক্যানসার

হরমোনের গঠনগত সমস্যায় থাইরয়েড গ্ল্যান্ড ফুলে যেতে পারে। তবে ফোলা মানেই ক্যানসার— এমন ভাবার কারণ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো গ্ল্যান্ডের ইউএসজি করে দেখা উচিত। প্রয়োজনে ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি করেও দেখা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ফুলে ওঠা অংশটির ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না, নির্ধারণ করা সম্ভব। অনেকেই ক্যানসার হলে তা আরও ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে পরীক্ষাটি করতে দ্বিধা বোধ করেন। ধারণাটি ভুল। ঠিক সময়ে অসুখ ধরা পড়লে চিকিৎসায় তা সারিয়ে ফেলা সম্ভব।

থাইরয়েডের সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব। তাই ভয় না পেয়ে সময় থাকতেই সচেতন হওয়া জরুরি।

সমস্যার মোকাবিলা- নিজের যত্ন নেওয়া

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এমন এক দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং যথাযথ চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবহার। যদিও এই চিকিৎসা মানুষের মানসিক অসুস্থতা দূর করতে সাহায্য করলেও, চিকিৎসার পরেও তার মানসিক বিষণ্ণতা বজায় থাকতেই পারে। সেক্ষেত্রে তার করণীয় হল-

  • নিজের মেজাজ-মর্জির বদল সম্পর্কে ডাক্তারের সঙ্গে কথাবার্তা বলা
  • এবিষয়ে বিশ্বাসভাজন কারও সঙ্গে কথা বলা
  • শারীরিক কসরত বা যোগব্যায়াম করা
  • নিজের সহযোগী দলে যোগদান করা
  • একজন মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া

Comments are closed.