দার্জিলিং ভ্রমণ ও দর্শনীয় স্থান

বন্ধুরা কেমন আছো ? আশা করি সবাই ভালোই আছো। বন্ধুরা ঠান্ডা তো পরেই গেল, আর এই ঠান্ডায় আমরা সব থেকে বেশি বেড়াতে যাই বা ঘুরতে যাই। আর এই সময় দার্জিলিং হচ্ছে আমাদের এক অন্যতম ঘোরার জায়গা। বলাই যায় যে দার্জিলিং হল উন্নত ও অন্যতম শৈল শহরের  পাহাড়ের রানী। এই শৈল-শহরটি ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যকালে স্থাপিত হয়েছিল, এই সময় ব্রিটিশরা দার্জিলিং-এ একটি সামরিক ডিপো এবং স্বাস্থ্যনিবাস স্থাপিত করেছিল। এর আগে, দার্জিলিং প্রাচীন গোর্খাদের রাজধানী ছিল। পরবর্তীকালে, সিকিমের মহারাজা ব্রিটিশদেরকে দার্জিলিং উপহার দেন। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত দার্জিলিং তার চা-উৎপাদন ও দার্জিলিং-হিমালয় রেলপথের জন্য সু-প্রসিদ্ধ; যেটি আবার ইউনেস্কো (ইউ.এন.ই.এস.সি.ও)-র একটি পৃথিবীর ঐতিহ্যগত স্থান। দার্জিলিং সর্বদাই তার নিদারুণ সৌন্দর্য্য ও মনোরম জলবায়ুর কারণে ভারতের এক জনপ্রিয় অবকাশ-যাপনের গন্তব্য। পর্যটন ছাড়াও, দার্জিলিং তার বিভিন্ন ব্রিটিশ ভঙ্গিমার সার্বজনীন বিদ্যালয়ের জন্য জনপ্রিয়, যেগুলি সমম্ত ভারত জুড়ে এবং এমনকি প্রতিবেশী দেশের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে।

দার্জিলিং এর কিছু দর্শনীয় স্থান

দার্জিলিং একটি পর্যটন মূখর স্থান এবং বছরের পর বছর ধরে পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসে। যদিও দার্জিলিং ঘোরার জন্য কেউ  কোনো ঋতুই ধার ধারেনা, তবু শীত কালেই পর্যটকের বেশি ভিড় জমে। দার্জিলিং-এ মনোরম আবহাওয়া ও নিদারুণ সৌন্দর্য্য ছাড়াও, এখানে প্রচুর দর্শনীয় জিনিষ রয়েছে। দার্জিলিং জুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে বেড়ানোর জন্য প্রায় ১৭টি আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত রেলওয়ে স্টেশন রয়েছে এখানে।সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সুন্দর সূর্যোদয় দেখা যায় এখানে। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা-স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি, ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ।বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ স্নো লুপার্ড খ্যাত দার্জিলিং চিড়িয়াখানা,পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট’,এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ, কেবল কারে করে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ। তার মধ্যে কিছু নিদারুন অসাধারণ দর্শনীয় স্থানগুলো হল –

হ্যাপী ভ্যালি টি গার্ডেন

দার্জিলিং শহর থেকে ১ কিলোমিটার দূরে, হ্যাপী ভ্যালি টি গার্ডেন-লেবাং কার্টার রোডে অবস্থিত এবং ব্যস্ততাপূর্ণ পর্যটনমূখর দার্জিলিং-য়ের এক শান্ত ও স্নিগ্ধ প্রবেশপথ।“টয় ট্রেন”-নামেও পরিচিত, এই দার্জিলিং হিমালয় রেল নিউ জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং-য়ের মধ্যে চলাচল করে এবং এটি একটি সংঙ্কীর্ণ গেজের রেলপথ। এই রেলপথটি একটি ইউনেস্কো (ইউ.এন.ই.এস.সি.ও)-র বিশ্ব ঐতিহ্যগত স্থান এবং এই রেলপথে দার্জিলিং ভ্রমণকালে পর্বতের এক অতীব সৌন্দর্য্য দৃশ্যমান হয়। হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে বসে তাৎণিকভাবে পৃথিবীখ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত মনোরম খেলাধুলার স্থান দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।

টাইগার হিল

দার্জিলিং থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে, ২৫৯০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত টাইগার হিল্, মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘার একটি দর্শনীয় দৃশ্য প্রদর্শন করে। এইজন্য খুব ভোরের দিকে টাইগার হিল-এ গিয়ে পর্বত শৃঙ্গের উপর থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়।  পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল পদ্মজা নাইডুর স্মৃতির উৎসর্গে ১৯৫৮ সালে এই চিড়িয়াখানাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। দেশের সর্বোত্তম চিড়িয়াখানাগুলির মধ্যে, এটিই এমন এক অন্যতম চিড়িয়াখানা যেখানে বন্য নেকড়ের বৃদ্ধির উত্থাপন করা হয়। এছাড়াও এই চিড়িয়াখানাটি বিভিন্ন বিপন্ন প্রজাতি যেমন-লাল পান্ডা, সাইবেরীয় বাঘ ও তুষার পাহাড়ী চিতার আবাসস্থল।

ধীরধাম মন্দির

ধীরধাম মন্দির একটি ধর্ম সংক্ৰান্ত তীর্থস্থান বলি আমরা। ভারতীয় উপ-মহাদেশের যে কোনও প্রান্তে ভ্রমণে গেলে, একটি জিনিষ খুবই নিশ্চিত যে, সব জায়গায় অন্তত একটি প্রাচীন শিব মন্দির খুঁজে পাবেন। টয় ট্রেন রেলওয়ে স্টেশনের ঠিক ওপরে অবস্থিত ধীরধাম মন্দির হল সর্বদাই মনে জুড়ে থাকা একটি অত্যন্ত সুন্দর মন্দির। এই বর্ণময় মন্দির ভবনটি হিন্দুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা, ভগবান শিবের নিবাস ভবন।এটি দার্জিলিং শহরের সবচেয়ে এক প্রাচীনতম মন্দির।

অবসারভেটরী হিল

অবসারভেটরী হল সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য না দখলে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না যে এর মজাটা কোথায়। এই জায়গায় হিন্দু ও বৌদ্ধ, এই উভয়েরই ধর্মীয় তাৎপর্য্য রয়েছে। এই পর্বতের উপরে অবস্থিত মহাকাল মন্দিরটি ভগবান শিবের প্রতিমূর্তি রূপে অনুমিত হয়। স্থানান্তকরণের পুর্বে ভুটিয়া বস্তি গুম্ফা এখানে অবস্থিত ছিল। সুতরাং, এই অবসারভেটরী হিল হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়েরই দর্শনীয় স্থান।

সেন্ট আ্যন্ড্রিউ’স চার্চ

সেন্ট আ্যন্ড্রিউ’স চার্চ হল একটি শ্রেণী বিশেষ যা  ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে টাচ করে। ১৮৪৩ সালে নির্মিত এই সেন্ট আ্যনড্রিউ’স চার্চ হল একটি প্রাচীন বিলাতি গির্জা এবং স্কটল্যান্ডের অনুগ্রাহক সন্ত, সেন্ট আ্যন্ড্রিউ-এর নামানুসারে এটির নামকরণ করা হয়। প্রারম্ভে এই গির্জার উপাসকরা ছিলেন স্কটিশ সৈন্য এবং চা-শ্রমিকেরা। গির্জাটি একটি ভূমিকম্পে গম্ভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৮৭৩ সালে এটির পুর্ননির্মাণ করা হয়।

এর পাশাপাশি ওয়্যার মেমোরিয়্যাল হল ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পূর্বে বিভিন্ন যুদ্ধে দেশের জন্য প্রাণ সমর্পিত করা সাহসী সৈন্যদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই ওয়্যার মেমোরিয়্যালটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

চৌরাস্তা এবং দ্য মল্

কৌতুক বা বিনোদনের মধ্যে এটা পরে। মল্ রোডটি চৌরাস্তায় উৎপত্তি ও সীমান্তে অবস্থিত, এটি মূলত শহরের হৃদয়স্থল এবং সাধারণত মানুষজন এই সড়কে সারিবদ্ধ দোকান ও রেস্তোঁরা-গুলিতে ঘুরতে, কেনাকাটা ও খাওয়া-দাওয়া করতে আসে। চৌরাস্তা থেকে দর্শন খুবই চমকপ্রদ এবং এটি দার্জিলিং-এর এক সবচেয়ে অন্যতম জনপ্রিয় স্থান।

কোথায় থাকবেন?

দার্জিলিং শহরে রয়েছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেলে প্রতিদিনের থাকা এবং খাওয়াসহ জনপ্রতি ভাড়া পড়বে প্রায় ৮৫০-১২০০ টাকা । প্রায় প্রতিটি হোটেলেই রয়েছে দর্শনীয় স্থানসমূহ, ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় জিপ, সার্বক্ষণিক গরম জলের ব্যবস্থা, ঠাণ্ডা প্রতিরোধের ওষুধসহ যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সেবা।

খাবার-দাবার

ট্যুরিস্টদের জন্য হোটেলগুলোতে রয়েছে সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা। ফলে পুষ্টিকর ও রুচিসম্মত খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। কলকাতা থেকে ও কলকাতার বাইরে থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ট্যুরিস্টের আগমনের ফলে একেবারে বাঙালি রুচিসম্মত খাবার-দাবারের জোগান দিয়ে থাকেন এখানকার হোটেল মালিকরা। কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ চড়াও আরও অনেক বীরত্বের থেকেও আসে পর্যটক যেখানে শুধুমাত্র বাঙালি থাকে না, থাকে ভিন্ন জাতির মানুষ।  ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং ডিনার ছাড়াও ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টি’র ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।

কেনাকাটা

দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের কোল ঘেঁষেই রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় মার্কেট। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য প্রায় সব জিনিসই আপনি পেয়ে যাবেন এখানে এবং তা আপনার ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই। সবচেয়ে ভালো যা পাবেন তা হল শীতের পোশাক। আপনার পছন্দমতো মূল্যে হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ যে কোনো প্রকারের লেদার জ্যাকেট পেয়ে যাবেন এখানে। এছাড়াও  ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন অসাধারণ কাজ করা নেপালি শাল এবং শাড়ি যা কি না  আপনার পছন্দ হতে বাধ্য। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার জন্য সর্বনিম্ন ২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অ্যান্টিক্স ও নানাবিধ গিফট আইটেম। তাছাড়া আকর্ষণীয় লেদার সু আর বাহারি সানগ্লাস তো আছেই।

কিভাবে যাবেন ট্রেনে বা রেলপথে ?

কলকাতা থেকে 

দিল্লি থেকে 

শেষ কথা 

বন্ধুরা এখানে শেষ বারের মতন বলার কিছুই নেই। শুধু একটাই কথা বলবো  কোনো কথা চিন্তা না করে একবার ঘুরে আসুন। দেখবেন অনেকটাই ভালো লাগেজে। আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করবে না এটা আমি বলে রাখলাম। অনেকের শারীরিক পরিবর্তনের কথা অনেক ডাক্তার রাই বলে থাকেন, আমি তাতে বলছি যে দার্জিলিং হল একটা অন্যতম সেই পরিবর্তনের জায়গা। অল্প পয়সায় ভালো জায়গায় ঘুরতে চান তাতেও বলবো আপনি দার্জিলিং এ যান। আপনারা সকলেই পরিবারের সাথে বা বন্ধু বান্ধবের সাথে দার্জিলিং বাড়াতে যান আমি বলছি ভালো লাগবে। ধন্যবাদ।



Comments are closed.