পুরাতন আমাশয়ের চিকিৎসা – Treatment of Old Disease in Bengali

আমাশয় খুব প্রচলিত একটি  রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর এক ধরনের লোক আছে যারা এসে বলে, ‘আমার ক্রনিক ডিসেন্ট্রি। ১০ বছরের বা ১২ বছরের ডিসেন্ট্রি।
প্রথমে বলি, আমাশয় কী? যদি আপনার বারবার পায়খানা হয়। পায়খানার সঙ্গে যদি রক্ত বা মিউকাস যায়, তখন আমরা একে বলি আমাশয়। আমাশয় প্রধানত দুই ধরনের। একটি হলো এমোয়েবিক ডিসেনট্রি। আরেকটি হলো বেসিললারিক ডিসেনট্রি। তবে এই আমাশয়গুলো দীর্ঘমেয়াদি নয়। এগুলো  স্বল্প মেয়াদির আমাশয়। তিন থেকে সাতদিনের। চিকিৎসা না করা হলেও চলে যেতে পারে  তবে জোড়ালোভাবে যদি আক্রান্ত হয় রোগী তাহলে চিকিৎসা করা দরকার এবং পাঁচ থেকে সাতদিনের ভেতর ভালো হয়ে যাবে। যারা পুরাতন আমাশয়ের (Chronic Dysentery) রোগী তারা অনেকেই এর থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে নানা প্রকার প্রাকৃতিক, ঘরোয়া, ভেষজ, হারবাল ঔষধের নাম অথবা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কথা চিন্তা করে থাকেন। অথচ অনেকেই জানেন না কোন চিকিৎসা পদ্ধতি পুরাতন আমাশয় ভাল করার উপায় হিসেবে অব্যর্থ কাজ করে। তাই আজ থাকছে পুরাতন আমাশয় নিরাময়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা।
তবে আরেক ধরনের মানুষ আছে আমাদের দেশে। যারা বলে, ‘আমার তো ক্রনিক ডিসেনট্রি।’ যদি বলি, ক্রনিক ডিসেনট্রি বুঝলেন কীভাবে? বলবে, – আমার মলের সাথে সবসময় মিউকাস যায়, আম যায়। পেটে ব্যথা থাকে। আসলে সেগুলো আমাশয় নয়। আরেকটি রোগ রয়েছে যেটি আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়। এটিকে বলা হয় আইবিএস। ইরিটেবল বাউয়েল সিনড্রম। এটা নারিভুড়ির এক ধরনের ফাংশনাল রোগ। ফাংশনাল রোগ এই জন্য বলছি যে, এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কোনো কিছু পাওয়া যাবে না। কোনো ধরনের জীবাণু পাওয়া যাবে না। কোনো ধরনের প্যাথলজি পাওয়া যাবে না। যদি প্যাথলজি পাওয়া না যায় একে আমরা বলি ফাংশনাল রোগ। এই রোগের একটি প্রকৃতি হচ্ছে মাঝেমধ্যে মলের সাথে আম যাওয়া। এটি আইবিএসেরই একটি লক্ষণ। এটি আমাশয় নয়। এলোপ্যাথিতে এর তেমন ভালো চিকিৎসা না থাকলেও হোমিওপ্যাথিতে এই রোগ নির্মূলের প্রায় শতভাগ কার্যকর, স্থায়ী  এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা রয়েছে।
আরো জেনে নিন 
  • ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম আই.বি.এস (IBS)রোগ ও এর চিকিৎসা
  • গ্যাস্ট্রিক কি? গ্যাস্ট্রিক থেকে বাচার উপায় এবং কার্যকর চিকিৎসা

আমাশয়ে যখন রক্ত যায় 

এমোয়েবিক আমাশয় থেকে বেসিললারিক আমাশয় জোড়ালোভাবে হয়। এতে মলের সাথে আম এবং প্রচুর পরিমাণ রক্ত যাবে। পেটে ব্যথা থাকবে, পায়খানা হবে। আবার অনেক সময় পেটে ব্যথায়ই হবে তবে পায়খানা হবে না। অনেক সময় দেখা যাবে রোগীর সিস্টেমিক অন্যান্য রোগের অভিযোগগুলো চলে আসে। যেহেতু আপনি বারবার মল ত্যাগ করছেন, বারবার শরীর থেকে পানীয় বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই ফ্লুইড দিতে হবে, এটা হচ্ছে এক নম্বর। আর দুই নম্বর হলো, পায়খানাকে কালচার সেনসিটিভিটি করে যেভাবে রিপোর্ট আসে, ওইভাবে তার চিকিৎসা শুরু করতে হবে।  অথবা যেখানে কালচার সেনসিটিভিটি করার সামর্থ নেই বা রিপোর্ট পেতে রোগীর দুই তিনদিন সময় লেগে যেতে পারে, এতে করে রোগী মারাত্মক পর্যায়ে চলে যেতে পারে, তখন অনুসন্ধান ছাড়া যেই চিকিৎসা আছে, সেটা তাকে দিতে হবে।

আমাশয়ের ভেষজ দাওয়াই-

আমাশয় রোগে বারবার পায়খানার বেগ হয় এবং আমযুক্ত মল নির্গত হয়। আম এবং মলের সাথে কখনো আবার রক্ত মিশ্রিত মল হয়। জেনে নিন আমাশয়ের ভেষজ দাওয়াই-

  • কচি বেল কুচি কুচি করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করুন। এর মিহি চূর্ণ ১চা-চামচ  পরিমান সকালে ও সন্ধ্যায় খালিপেটে ১মাস সেবন করুন।
  • ইছবগুল দানা- ৬ গ্রাম, দধি ১কাপ একত্রে মিশ্রিত করে সকাল-সন্ধ্যায় ১০দিন সেবন করলে উপকার দর্শে।
  • ডালিম পাতা ১০টি একত্রে পাটায় পিশে পানিটুকু সকালে ও সন্ধ্যায় ৭-১০দিন সেবন করুন।
  • ধাইফুল চূর্ণ ১চা-চামচ আধা কাপ টক দধিতে মিশিয়ে সকালে এবং সন্ধ্যায় ২-৩ দিন সেবন করলে আমাশয় সেরে  যায়।
  • লাল চন্দন ৫ গ্রাম পরিমান আধা গ্লাস পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে সকালে জ্বাল দিয়ে ক্বাথ করে তাতে সামান্য মিসরি মিশিয়ে দিনে  ২/৩ বার খালিপেটে ৩-৫ দিন সেবন করলে উপকার হয়।
  • তজ চূর্ণ ৩ থেকে ৫ গ্রাম পরিমান ঢেকি ছাটা চালে মিশিয়ে ভাত রান্না করে ঐ ভাত দিনে ২বার খেতে হবে। এভাবে ৫-৭ দিন সেবন করলে পুরাতন আমাশয় রোগে উপকার পাওয়া যায়।
  • বহেড়া চূর্ণ ৩ গ্রাম পরিমান সকালে ও সন্ধ্যায় ৭-১০ দিন খালিপেটে সেবন করলে উপকার দর্শে।
  • বিহিদানা ৫ গ্রাম ১ গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে জ্বাল দিয়ে ক্বাথ করে ঐ ক্বাথ দিনে ২ বার খালিপেটে সেবন করলে উপকার দর্শে।
  • কালকেশী/ভৃঙ্গরাজ পাতার রস ১ চা-চামচ সকালে ও সন্ধ্যায় আধা কাপ ছাগলের দুধে মিশিয়ে ৭-১০ দিনসেবন করলে পুরাতন আমাশয়ে উপকার দর্শে।
  • সাদা ধূপ মিহি চূর্ণ করে ২৫০ মিলিগ্রাম পরিমান দিনে ২-৩ বার খালিপেটে ২-৩ দিন সেবন করলে রক্ত আমাশয়ে উপকার হয়।
  • থানকুনি পাতার রস ২চা-চামচ সকাল-সন্ধ্যায় খালিপেটে সেবন করলে উপকার দর্শে।
  • মোটা বিচিকলা ২টি পাকা অবস্থায় বিচিসহ দিনে দুইবার চিবিয়ে খেতে হবে ৩-৫ দিন। এতে তরুণ আমাশয়ের উপকার হয়।

শেষ কথা 

আমাদের সবসময় খাওয়াদাওয়াকে খুব ভালো ভাবে বুঝে খেতে হবে। খুউব বেশি তেল মশলা খাওয়া একদমই চলবে না। খুউব বেশি বাড়াবাড়ি হলে ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে মেডিসিন নিতে হবে। তবে ঘরোয়া বলতে নুন চিনি জল তা আমাদের বাড়ে বাড়ে খেতে হবে নুন চিনি জল অথবা ORS আমাদের এই সময় খুব উপকার দেয়। এলোপ্যাথিতে এই চিকিৎসায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর চেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হল হোমিওপ্যাথি যা রোগকে তার মূল থেকে নির্মূল করে দেয়। এর জন্য রেজিস্টার্ড এবং অভিজ্ঞ কোন হোমিও চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে ট্রিটমেন্ট নিন। চিকিৎসা প্রপারলি করা হলে আমাশয় তা যত দিনের পুরাতনই হোক না কেন নির্মূল হতে বাধ্য।

 লেখক – শান্তনু পাল 

Comments are closed.