সর্দি কাশির চিকিৎসা

যেহেতু এখন বর্ষাকাল সেহেতু আমাদের এই সময় অনেকটাই নানান রকমারি অসুক বিসুখ দেখা যায়, তার মধ্যে সর্দি কাশি হল গিয়ে প্রধান। অর্থাৎ এই বর্ষাকালে আমাদের সর্দিকাশি কম বেশি হয়েই থাকে। বর্ষাকালে বৃষ্টিতে ভিজলে সেটা কিন্তু আমাদের শরীরে বিভিন্ন ইনফেকশন নিয়ে আসে। ঠান্ডা লাগলে নিজেদের শরীরের ব্যাপারে অবহেলা করে থাকি এবং তার জন্য আমাদের পরে ভুগতে হয়। প্রকৃতিতে চলছে আবারো ঋতু পরিবর্তনের হাওয়া। ঋতু পরিবর্তন হলেই বেশিরভাগ মানুষেরই সর্দি-কাশির সমস্যা হয়। বিশেষ করে যাঁদের রয়েছে ঠান্ডা অ্যালার্জির সমস্যা, তাঁরা বিপদে পড়েন সবচেয়ে বেশি। সর্দিকাশি এখন ঘরে ঘরে খুব কমন ব্যাপার যদিও তাও আমাদের দেখতে হবে যে সর্দি কাশি হবার কারণ ও তার প্রতিকার কি। আমরা জেনে নেবো ঘরোয়া উপায়ে কিভাবে আমাদের এই সর্দি কাশি থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আমরা অনেকেই আছি ছোট খাটো কিছু হলেই আমরা ডাক্তারের কাছে দৌড়োই। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে যেমন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত তেমন ছোট খাটো ব্যাপারে এক দু বার ঘরোয়া টোটকাও ব্যবহার করা উচিত। আসুন আমরা এবার জেনে নি কিভাবে আমরা আমাদের এই সর্দি কাশির থেকে মুক্তি পাবার ঘরোয়া টোটকা।

সর্দি কাশির ঘরোয়া চিকিৎসা

  1. খাঁটি সরিষার তেল সর্দি-কাশিতে খুবই উপকারী। একটি স্টিলের পাত্রে ২-৩ টেবিল চামচ বা যতটা আপনার মালিশের জন্য লাগবে ঠিক ততটা সরিষার তেল নিন কয়েক কোয়া রসুন থেঁতো করে তেলে মধ্যে দিন। এবার তেল গরম করুন। তেল ফুটে উঠলে নামিয়ে ফেলুন। এই তেল উষ্ণ অবস্থায় গলায়, বুকে ও পিঠে মালিশ করুন। এতে কাশি, বুকের কফ, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি দ্রুত উপশম হবে। মাথাব্যথা সারাতে এই তেল মাথার তালুতে ঘষে ঘষে লাগান। ঠান্ডার সমস্যা কাটাতে এই তেল খেতেও পারেন।
  2. সর্দি কাশিতে আমাদের অনেক সময় গলা ব্যাথাও করে থাকে তার জন্য নুন জল দিয়ে গারগেল করা আমাদের গলার ব্যাথা আর সর্দি কাশির থেকে আরাম পেতে সাহায্য করে। প্রথমে একটি পাত্রে উষ্ণ গরম জল নিতে হবে। তারপর উষ্ণ গরম জলে নুন মিশিয়ে সেই নুন জল দিয়ে গারগেল করতে হবে। চাইলে নুনের সাথে হলুদও মেশাতে পারেন। নুন এবং হলুদ আমাদের সর্দি সারাতে সাহায্য করে এবং আমাদের গলা ব্যাথায়ও কমায়। তাছাড়া খাবার খাওয়ার সময় ঠান্ডা জলের জায়গায় গরম জল খেলে আমাদের গলায় আরাম হয় এবং সর্দি কাশিও তাড়াতাড়ি সেরে যায়। গরম জল আমাদের ফুলে যাওয়া টনসিলকে কমায় এবং ঠান্ডা লাগার ইনফেকশন শরীর থেকে বের করে দেয়।
  3. একটি আদার টুকরোকে ছোট ছোট করে কেটে তার সাথে নুন মেশাতে হবে। তারপর ওই নুন মেশানো আদা মুখে নিয়ে কিছুক্ষন চিবোতে হবে। এই পদ্ধতিটি আমাদের সর্দি কাশি দূর করতে খুবই কার্যকরী।আবার আদা এবং তার সাথে তুলসী পাতা থেঁতো করে মধু মিশিয়ে আর একটি মিশ্রণ তৈরি করা যায়। এই মিশ্রনটি প্রচন্ড কার্যকরী সর্দি কাশি দূর করার জন্য। আদার সাথে তুলসী এবং মধু মিশিয়ে খেলে সর্দি কাশি দূর হওয়ার সাথে সাথে আমাদের গলা ব্যাথ্যাও দূর হয় এবং আমরা গলায় আরাম অনুভব করি।
  4. দুধকে গরম করে তার মধ্যে হলুদ মেশাতে হবে। এই হলুদ দেওয়া দুধ আমাদের সর্দি কাশি দূর করতে সাংঘাতিক ভাবে উপকার করে। এই মিশ্রণটি খেলে খুব তাড়াতাড়ি আমরা সুস্থ্য হয়ে উঠতে পারি। কাশি দূর করতেও এই হলুদ সহ দুধ খাওয়া খুব উপকারী। গরম দুধ আমাদের গলায় আরাম এনে দেয় এবং হলুদ আমাদের সর্দি কাশি দূর করে।
  5. আমাদের সর্দি সারানোর একটি চট জলদি উপায় হল স্টিম নেওয়া। স্টিম নেওয়ার জন্য একটি পাত্রে গরম জল নিতে হবে এবং তার মধ্যে চা গাছের তেল বা ট্রি অয়েল মেশাতে হবে। এরপর আমাদের মুখটি ওই গরম জলের উপর রেখে মাথার উপরে তোয়াল দিয়ে ঢাকা দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যে হিটপ্রুফ বাটি নেওয়া হয় যাতে গরম বাটি আমাদের ত্বকে না লাগে। খুব বেশি গরম লাগলে কিছুক্ষনের জন্য তোয়ালের থেকে বেরোনো যেতে পারে। এই পদ্ধতিটি দিনে ২-৩ বার  ১৫-২০ মিনিট করলেই আমরা আমাদের সর্দি কাশি দূর করতে পারি খুব তাড়াতাড়ি।
  6. একটি পাত্রে গরম জল নিতে হবে। সেই গরম জলে ১ চামচ লেবুর রস এবং ২ চামচ মধু মেশাতে হবে। ব্যাস আর কি আমাদের সিরাপ তৈরি! এই সিরাপটি বানিয়ে দিনে অন্তত একবার খেতে হবে। এর ফলে আমাদের ঠান্ডা লাগা কমে যায় এবং তার সাথে সর্দি কাশি, মাথা ব্যাথাও দূর হয়। এই মিশ্রণটি আমাদের হজম করার শক্তিও বাড়ায়। তাহলে ঠান্ডা লাগলে এই সিরাপটি খেয়ে একবার তার গুণের পরীক্ষা করে নেওয়া করা উচিত।তাহলে আজ আমরা সর্দি কাশি দূর করার ৫টি ঘরোয়া উপায়ে জেনে নিলাম। উল্লেখিত সব কটি উপায়ই কিন্তু খুবই কার্যকরী। তা ছাড়াও আরো কয়েকটি উপায় আছে যা ঠান্ডা লাগলে তার চিকিৎসা জন্য করা যেতে পারে যেমন প্রচুর পরিমানে জল খাওয়া, গরম চা, কফি বা দুধ খাওয়া ,নাক পরিষ্কার করা ইত্যাদি।এই কয়েকটি পদ্ধতি মেনে চলার পরও বহু দিন ধরেও যদি সর্দি কাশি না কমে তাহলে আমাদের অবশ্যই উচিত ডাক্তার দেখানো।
  7. ৩-৪ টুকরো আদা, ২-৪ কোয়া রসুন, ২-৩ টি দারুচিনি, ৫-৬ টি গোলমরিচ একটি বাটিতে নিয়ে শিলনোড়া দিয়ে থেঁতলে তারপর এই মিশ্রিত উপাদান দিয়ে চা বানিয়ে প্রতিদিন ১-২ বার পান করুন। এটি পান করলে কফ ও কাশির পরিমাণ এবং সর্দি দিয়ে নাক বন্ধের সমস্যা কমে যায়।
  8. কফের পরিমাণ বেশী থাকলে ২ টি মধ্যম আকারের পেয়াজ, এক গ্লাস পানি এবং এক টেবিল চামচ মধু নিয়ে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে জুস বানিয়ে নিন এবং কফ বেশী থাকলে প্রতিদিন পান করুন।
  9. ঠাণ্ডা লাগলে অনেকেই কাশির জন্য ঘুমাতে পারেন না এজন্য এক গ্লাস গরম দুধে এক চা চামচ ভালো মানের হলুদের গুঁড়ো এবং আদার রস মিশিয়ে পান করুন এটি খেলে কাশির পরিমাণ কমে যায়। তবে গলায় কফ বেশী থাকলে গরম দুধের পরিবর্তে গরম পানি ব্যবহার করুন।
  10. ঠাণ্ডা লাগলে অনেকের কফ জমে গলা বসে থাকে যা কখনো কখনো বেশ কষ্টকর। তাই গলায় সবসময় কফ জমাট হয়ে থাকলে মাঝে মাঝে কয়েকটি দারুচিনি চিবোতে পারেন, এতে গলায় কফ জমে থাকার পরিমাণ হ্রাস পায়।
  11. ঠাণ্ডা লাগলে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন প্রতিদিন । সারাদিনে কমপক্ষে ১০ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করুন। কণ্ঠ নালীকে আর্দ্র রাখতে বেশী বেশী পানি খাওয়া জরুরী। পানি কম খেলে গলায় কফের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
  12. কারো কারো ঠাণ্ডার সময় গলার টনসিলে অনেক ব্যথা হয় এমনকি কথা বলাও কখনো কখনো কঠিন হয়ে যেতে পারে। সাধারণত টনসিলে প্রদাহ হবার কারণে এমন ব্যথা হয় এজন্য গরম পানি নিন তাতে এক টেবিল চামচ হলুদের গুঁড়ো বা এক টেবিল চামচ হলুদের রস মিশান এবং উষ্ণ অবস্থায় পান করুন তবে অবশ্যই উষ্ণতা গলায় সহনীয় হতে হবে।
  13. টনসিলের ব্যথা ও গলার কফ কমাতে অল্প একটু খানি মাথা ব্যথায় ব্যবহার করার উপযোগী বাম গলায় মালিশ করুন এরপর ইস্ত্রি দিয়ে একটি মোটা কাপড় গরম করুন এবং সহনীয় তাপমাত্রায় কাপরটি দিয়ে গলায় সে%ক নিন।
  14. রাতে কাশির জন্য ঘুম হচ্ছেনা? তাহলে আদা কুচি কুচি করে কেটে তা অল্প একটু খানি লবণ দিয়ে আস্তে আস্তে চিবিয়ে খান এটি খেলে কাশিতে যেমন উপকার পাওয়া যায় তেমনি গলার কফের পরিমাণও হ্রাস পায়।

শেষ কথা 

সর্দি কাশি বর্ষাকাল এ সবথেকে বেশি হয়ে থাকে তবে এই সর্দি কাশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বারো মাসেরই গল্প অর্থাৎ সর্দি কাশি বর্ষাকালে বেশি হলেও সব ঋতুতেই কম বেশি হয়েই থাকে। তার জন্য আমাদের ভয় পেয়ে চিন্তিত না হয়ে ওপরের উল্লেখিত নিয়ম ও ঘরোয়া চিকিৎসা করলেই আপনি ফল পাবেন নিশ্চিত। কোনো কারণে যদি আপনার কাশি না কমে এই ঘরোয়া চিকিৎসাতে তাহলে আপনি বুঝবেন আপনার এই সর্দি কাশি কোনো সাধারণ সর্দিকাশি নয় বেশি দাঁড়িয়ে গেছে তৎখনাত বেশি দেরি না করে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করা উচিত বা ডাক্তার কে দেখানো উচিত। ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন। ধন্যবাদ।

লেখক – শান্তনু পাল 


Comments are closed.