ব্রেস্ট ক্যান্সার – Breast Cancer Symptoms in Bengali Language

ক্যান্সার মানেই আমরা জানি রাজ রোগ। আমাদের ছোট বড়ো সব রোগের মধ্যে এই ক্যান্সার রোগ  টা আমাদের সব থেকে চিন্তায় ফেলে দেয়। আমরা অনেকেই জানি বা মানি যে, যার একবার ক্যান্সার হয়েছে বা হবে সেই মানুষ আর বাঁচবে না আজ হোক বা কাল হোক মারা যাবেই। আর তাছাড়া একথা সত্যি যে ক্যান্সার এর নাম শুনলেই মানুষ অর্ধেক মরেই যায় চিন্তায়।  কিন্তু এরকম বহু মানুষ আছে যারা ক্যান্সার এর আক্রান্ত হলেও দিব্বি ভালো আছে আর বেঁচেও আছে অনেকদিন আর এখন কোনো সমস্যাও হয়না আর তাদের। এরোকোম বহু মানুষ আছেন যাদের ক্যান্সার ছিল সেটানির্মূল  হয়ে ভালো আছেন। ক্যান্সার বাড়ছে, তবে পাশাপাশি বাড়ছে এই রোগটি সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা। মানুষ বুঝতে পেরেছে ক্যান্সার মানেই মৃত্যু নয়। এতে লড়াইয়ের নানা রকম সুযোগ রয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে ক্যান্সার সেরেও যেতে পারে বা ক্যান্সারকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। বাড়বাড়ন্ত অবস্থায় ধরা পড়লেও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে রোগীর কষ্ট প্রশমিত করা যেতে পারে। ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা। পুরুষ এবং মহিলা উভয়েরই এ রোগ হতে পারে, তবে মহিলাদের মধ্যেই এর প্রবণতা বেশি দেখা যায়।  তবে আশার কথা হলো সঠিক সময়ে এর নির্নয়ে আমরা সহজেই এর চিকিৎসা করতে পারি। আজ আমরা স্তন ক্যান্সার কি এবং এর চিকিৎসার কথা জানবো। আজকের আমাদের বিষয়বস্তু হল ব্রেস্ট ক্যান্সার। আমরা প্রথমেই জন্য যে ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার কি ?

ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার কি ?

স্তনের কিছু কোষ যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠে তখন স্তন ক্যান্সার হতে দেখা যায়। অধিকাংশ মহিলাদের জন্য এই রোগ একটি আতঙ্কের কারণ। স্তন ক্যান্সার সারা বিশ্বে মহিলাদের ক্যান্সার জনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারন।

ব্রেস্ট ক্যান্সার বা স্তন ক্যান্সার লক্ষন 

স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার হলে সাধারণত নিচে দেওয়া  লক্ষণ গুলি দেখা যায় –

  • স্তনের বোঁটা ভিতরের দিকে ঢুকে যায়। 
  • স্তনের ত্বকে পরিবর্তন দেখা দেয়, যেমন-টোল পড়া। 
  • স্তনের বোঁটার চামড়া উঠতে থাকে। 
  • স্তনে একটি পিন্ডের মত অনুভব হয়। 
  • স্তনের ত্বক লালচে যেমন-কমলার খোসার মতো এবং গর্ত-গর্ত হয়ে যায়। 
  • স্তনের আকার ও আকৃতির পরিবর্তন হয়। 
  • স্তনের বোঁটা থেকে রক্ত বের হয়। 
  • স্তনে একটি পিন্ডের মত অনুভব হয়। 

কমবেশি সব মহিলাদের স্তনেই লাম্প থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি ক্যানসারাস ও কয়েকটি নন-ক্যানসারাস। এই ব্রেস্ট লাম্পগুলি অনেক সময় আন্ডারআর্ম বা কলার বোনের তলাতেও দেখা যায়। এছাড়া স্তনবৃন্তের আশপাশেও এই ধরনের লাম্প থাকে যেগুলি টিপলে শক্ত লাগে এবং অবস্থান পরিবর্তন করে না। এমন কিছু দেখলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

কোনও রকম র‌্যাশ নেই স্তনে, তবু ইচিং বা চুলকানির মতো অনুভূতি হচ্ছে, এমন কিছু কিন্তু ক্যানসারের লক্ষণ। অনেক সময় এর সঙ্গে নিপ্‌ল থেকে হালকা হালকা রস‌ নিঃসৃত হয়, স্তনের ত্বকেও কিছুটা পরিবর্তন আসে। তাই চুলকানির মতো কিছু হলে নিজে থেকে কোনও ক্রিম বা লোশন লাগাবেন না। আগে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন।

স্তনে টিউমার থাকলে তা আশপাশের ব্রেস্ট টিস্যুগুলির উপর চাপ সৃষ্টি করে এবং তার ফলে স্তনে একটা ফোলা ফোলা ভাব দেখা যায়। এরই সঙ্গে স্তনে লাল ভাবও থাকে। স্তনে হাত দিলে বা চাপ দিলে ব্যথাও লাগে।

অবশ্যই কখন ডাক্তার দেখাবেন

  • স্তনের বোঁটা থেকে অনবরত রক্ত নির্গত হলে। 
  • স্তনের পিন্ড আরও বড় এবং শক্ত হলে
  • স্তনের বোঁটা ভিতরের দিকে ঢুকে গেলে
  • পরবর্তী মাসিক পার হয়ে গেলেও পিন্ড না গেলে
  • স্তনের ত্বকে পরিবর্তন দেখা দিলে
  • স্তনে নতুন এবং অস্বাভাবিক পিন্ড অনুভব করলে

কি ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন ?

  • মেমোগ্রাম (Mammogram) বা স্তনের এক্স-রে ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • ব্রেস্ট আলট্রাসাউন্ড (Breast ultrasound)  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • ব্রেস্ট ম্যাগনেটিক রিজোন্যান্স ইমাজিং (Breast magnetic resonance imaging, (MRI)  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • বায়োপসি (Biopsy)  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • রক্তের পরীক্ষা  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • বুকের এক্স-রে  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফী স্ক্যান (Computerized tomography (CT) scan)  ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে )
  • পজিট্রন ইমিশন টমোগ্রাফী স্ক্যান (Positron emission tomography (PET) scan) ( ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ) 

স্তন ক্যান্সোরের চিকিৎসা নির্ভর করে স্তন ক্যান্সারের ধরণ, পর্যায় ক্যান্সারের কোষগুলো হরমোণ সংবেদনশীল কিনা তার উপর। অধিকাংশ মহিলারাই স্তন অপারেশনের পাশাপাশি অন্যান্য বাড়তি চিকিৎসাও গ্রহণ করে থাকেন। যেমন: কেমোথেরাপী,হরমোণ থেরাপী অথবা রশ্মি থেরাপী। 

ক্যান্সার প্রতিরোধের খাবার 

অনেক বেশি আঁশযুক্ত খাবার ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমাতে পারেএর ফলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% পর্যন্ত কমে। মটরশুঁটি, তাজা ফল, আস্ত শস্য এবং ফ্ল্যাভনয়েড,ব্রোকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও  ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ সবজি খান। পেঁয়াজ, রসুন, পেঁয়াজ পাতা ইত্যাদি সবজিগুলো ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রি র‍্যাডিকেলকে নিরপেক্ষ করে এবং ক্যান্সার কোষের বিভক্ত হওয়া প্রতিরোধ করে। এইধরনের সবজি কাঁচা খেলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সয়াবিন ও অন্য সয়া পণ্য যেমন- টফু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। কিন্তু মিষ্টি স্বাদের ও রিফাইন্ড সয়া পণ্য যেমন- সয়া দুধ ও সয়া তেল এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন চিনি ক্যান্সারের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। চিনি ক্যান্সার জিনকে সক্রিয় করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিতে জ্বালানী হিসেবে কাজ করে।

যেসব নারীরা ধূমপান করেন বা ক্রমাগত পরোক্ষভাবে ধোঁয়ায় আক্রান্ত হন তাদের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ৪০% এর ও বেশি। যাদের অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস আছে তাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। যদি এই অভ্যাসগুলো আপনার থেকে থাকে তাহলে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করুন।

আপনি কি জানেন পেয়াজ ক্যান্সার নামক মারাত্মক রোগের সংক্রমন থেকে লড়তে সাহায্য করে? পেয়াজ সাধারণত আমরা রান্নায় ব্যবহার করে থাকি কিন্তু মুখে গন্ধ হওয়ার কারণে আমরা অনেকেই কাঁচা পেয়াজ খাওয়া পছন্দ করি না কিন্তু এই লেখাটি পড়ার পর আশা করছি আপনি নিজেকে শুধরে নেবেন। পেয়াজে এমন কিছু উপাদান আছে যেমন পলিফেনল, ফ্ল্যাবনয়েডস, tannins, ফেনলিক অ্যাসিড, quercetin, স্টেরোলস, alliin, সালফার প্রত্যেকটি ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এবার একটু বিস্তারে জেনে নিন কাঁচা পেয়াজ কেন খাবেন।পেয়াজে প্রচুর পরিমানে আন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা আমাদের শরীরের সমস্ত দুষিত পদার্থ গুলিকে দেহের স্বভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহ থেকে দূর করতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত মদ্যপান বা অন্যান্য নেশা করার বস্তু গুলি বা বিভিন্ন প্রসেসড ফুড আমাদের দেহে যে সমস্ত অশুদ্ধি গুলির জন্ম দেয় তা অনেক সময় ক্যান্সারকে ত্বরান্নিত করে। এতে বর্তমান সালফার আমাদের দেহে হরমনের কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখে এছাড়া এই সালফার রক্তের অশুদ্ধি গুলিকে দূর করতে সাহায্য করে। আমাদের দেহে খাবার হজম করতে সাহায্যকারী এনজাইম গুলির ক্ষরণ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে এই সালফার।  এছাড়া আমাদের নার্ভ ও ব্লাড সেলের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এই প্রক্রিয়া গুলির যে কোনো একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেই আমাদের দেহে কারসিনোজেন তৈরী হতে পারে যার ফলে দেহের কোষ গুলি নষ্ট হয়ে ক্যান্সারের সংক্রমন ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

শেষ কথা 

সবার প্রথমেই একটা কথা বলবো যে আমি আগেও বলেছি যে ক্যান্সার এর কথা শুনে আমরা আগেই মারা যাই মনের দিক থেকে।  এটাই হয়তো আমরা বা সবাই ভেবে বসে থাকি যে এই রে আর হয়তো বেশি দিন বাঁচবো না। এই ধরণের চিন্তা ভাবনাটাই আমাদের ভুল এতে রোগ তো সারেই না উল্টে জাকরে ধরে। মাথা ঠান্ডা রাখুন। কোনরকম সূচনা পেলে সবার আগে আসে পাশের বা অন্য কারোর কথায় কান না দিয়ে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানো বা পুরো সমস্যাটা বলা উচিত। এই ক্ষেত্রে রোগীর রোগ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকাটাই ভালো। রোগীর যত্ন নেওয়া খুব দরকার সব দিক দিয়ে। যেহেতু আমাদের সমাজের মধ্যে ক্যান্সার একটা মৃত্যু বরণের রোগ বলে আমরা জানি সেহেতু রোগীকে না জানানোই ভালো যাতে করে রোগী আরও ভেঙে না পরে। ঠিক থাকে খাবার খাওয়ান। ঠিক থাকে মতন সেবা সুশ্রষা করুন। সবসময় ডাক্তারের সাথে পরামর্শকে থাকুন তাতে ভালো থাকবেন। ক্যান্সার কোনোরকম সিমটম দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে সরাসরি এক দিনও দেরি না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। ভালো থাকবেন, ভালো রাখবেন, সুস্থ থাকুন।  ধন্যবাদ।

লেখক – শান্তনু পাল  


Comments are closed.