স্বাধীনতা রচনা – Independence Essay in Bengali

ভারতের স্বাধীনতা

সাল টা ছিল ১৭৫৭, দিন টা ২৩এ জুন, স্থান পলাশী প্রান্তর। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, টগবগ করে ঘোড়া ছুটছে পলাশীর প্রান্তরে।একদিকে বাংলা র নবাব সিরাজ উদ দৌল্লা, তার সেনাপতি গন মীরজাফর, মীরমদন, রায়দূর্লভ, মোহনলাল অন্যদিকে ইংরেজ রা। সিরাজ এর মৃত্যু র সাথে সাথে বাংলা র ইতিহাস এ স্বাধীনতা যুদ্ধ অস্তমিত হয়। পরে ১৭৬৪ সালে  বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজ দের সাফল্য ছিল চূড়ান্ত ও প্রত্যক্ষ।

ইংরেজ দের ক্ষমতা বিস্তার

সমস্ত উত্তর ভারত ইংরেজ দের কুক্ষিগত হয়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বণিক এর মানদণ্ড রাজদণ্ড এ পরিণত হয়। ইংরেজ রা বেশ জাঁকিয়ে বসে ভারতীয়দের উপর অত্যাচার শুরু করে।স্বত্ববিলোপ নীতি, অধীনতামূলক নীতি প্রয়োগ করে, শিল্পের ক্ষেত্রে ভারতকে এক শুধুমাত্র কাঁচামাল সরবরাহকারীদেশে পরিণত করে, ভারতীয়দের উপর বিরাট করের বোঝা চাপিয়ে ইংরেজরা মানুষ গুলোর জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। সমস্ত ভারতবাসী দারিদ্র্যতায় ডুবতে থাকে। মিশনারীরা জোর করে হিন্দু মুসলমানদের ধরমান্তরিত করার চেষ্টা করছিল। সর্বোপরি এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে শূয়র ও গরুর মাংস এঁর চর্বি মিশিয়ে দেওয়ার ঘটনা তাদের মনের বিদ্রোহের আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়।

স্বাধীনতার স্পৃহা

পলাশির জুদ্ধের ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৫৭ সালে ব্যারাকপুরে র মঙ্গল পাণ্ডে এক ইংরেজ অফিসারকে হত্যা করে মহাবিদ্রোহের সূচনা করে। ড সুরেন্দ্রনাথ সেন একে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে অভিহিত করেন।এরপর চলতে থাকে জায়গায় বিদ্রোহ।স্বাধীন হওয়ার আশায় মেতে ওঠে ভারতবাসী।জনগনের পাশে দাঁড়ায় শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবি মানুষ। শুধুমাত্র বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ানো  অসম্ভব বিবেচনা করে আন্দলনের নেতৃবৃন্দ বয়কট অর্থে শুধুমাত্র বিলেতি বস্ত্র বা পন্যসামগ্রীই নয়,বিলাতি চিন্তাধারা, আদপ কায়দা সব কিছুই বর্জন করার আদর্শ প্রচার করেন।দেশের বিভিন্ন স্থানে কুটির শিল্প, ও দেশীয় পরিচালনায়ে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ড প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বেঙ্গল কেমিক্যাল, ড নীল্ রতন সরকার জাতীয় সাবান কারখানা, মাদ্রাজে চিদাম্বরম পিল্লাই স্বদেশী জাহাজ কোম্পানি তৈরি করেন। তবে সেই সময় উল্লেখ যোগ্য পদক্ষেপ হল স্যর জামসশেদজী টাটা প্রতিষ্ঠিত লৌহ ইস্পাত কারখানা।ছাত্রসমাজ বিদেশী কাগজ কলম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন করে।তারা বিদেশী কাপড় লবন চিনি মদ এঁর দোকানের সামনে পিকেটিং করে.১৯০৩ সালে ছাত্র দের পরিচালনায় স্বদেশি ভাণ্ডার গঠিত হয়।সেই সময়ে জাতীয় মহাবিদ্যালয়,বিভিন্ন স্থানে ২৪ টি মাধ্যমিক, ৩০০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়।স্বদেশি শিল্প কর্মে অংশগ্রহন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্র লাল রায়,অতুল্প্রসাদ সেন, রজনীকান্ত,অবনীন্দ্রনাথ ও নন্দলাল বসু প্রমুখ ব্যাক্তিত্ব।বাংলায় বিশিষ্ট বিপ্লবী নেতা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ওরফে বাঘাযতিন ছিলেন বাংলার যুগান্তর গোষ্ঠীর নেতা। বালেশ্বরে র কাছে বুরিবালামের নদীর তীরে বাঘাজতিন সংঘর্ষে লিপ্ত হন।এমন ই  চট্টগ্রামের মাস্টার দা সূর্য সেন,বিনয় বাদল দীনেশ এঁর অলিন্দ যুদ্ধ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পথ কে প্রশস্ত করেছিল।

ভারতীয় সংগ্রামের ইতিহাসে গান্ধিজি র ভুমিকা

১৯১৯ সালে গান্ধিজি ভারতীয় জাতিয় আন্দোলন এ নেতৃত্ব গ্রহন করেন।পরবর্তী ৩০ বছর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে গান্ধী যুগ নামে পরিচিত। রাওলাত আন্দোলনের মাধ্যমে গান্ধিজি সর্বস্তরের মানুষ কে একত্রিত করতে পেরেছিল।এই আন্দোলনের চরম পরিনতি ঘটে জালিয়ানয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে।এই হত্যাকাণ্ড সমগ্র ভারতে তিব্র ঘ্রিনার সৃষ্টি করে।এর প্রতিবাদ স্বরুপ রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর নাইট উপাধি ত্যাগ করে।এরপর গান্ধিজি অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গ্রহন করেন।.১৯২০  সালে গান্ধিজির নেতৃত্বে অসহ যোগ আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলন এঁর সুচনা হওয়ায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

নেতাজি সুভাসচন্দ্রের ভুমিকা

স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র ধারার মহানায়ক ছিলেন নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু।গান্ধিজির ত্রিপুরী কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তিনি ফরোয়ার্ড ব্লক নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন  করেন।ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ স্থাপন করেন।মহিলাদের নিয়েও সেনাবাহিনী গঠন করেন। ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন তোমরা আমাকে রক্ত দাও,আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।তার মৃত্যু রহস্যময়,কিন্তু তিনি যেখানেই থাকুন ভারতীয়দের মনে তিনি অমর, চির ম্রিত্যুঞ্জয়।ভারতে তিনি সবত্র জাগ্রত চেতনার ভাস্বর।

অন্তিম পর্যায়ে

নানা বিদ্রোহ, বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়।বাজি পুড়ল। মনের আনন্দের হাওয়াই উড়ল আকাশ পানে।আলো র ঝলকানিতে ভেসে গেল চারিদিক।তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী জহর লাল নেহেরুর তত্বাবধানে ভারতবর্ষ দ্বিখণ্ডিত হল।

দ্বিখণ্ডিত ভারত

বন্দিদশা থেকে মুক্ত হল ভারত।পাকিস্তান,  ভারত, বাংলাদেশ আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়।অনেক মানুষ গৃহহীন হল।বলা হয়েছিল যারা ছিন্নমূল হয়ে এসেছে এদেশে তাদের সকল কে  যোগ্য আশ্রয় দেওয়া স্বাধীন ভারতের কর্তব্য।যদিও অনেকে ই আশ্রয় পাননি। স্রোতের শ্যাওলা র মত এ ঘাটে ও ঘাটে ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত অনেকের জায়গা হয় ভারতে।উদ্বাস্তু রা দল বেঁধে ফাঁকা জায়গায় গড়ে তুলল কলোনি। শিল্পে বিপ্লব আসে। স্বাধীন দেশে তৈরি হল কলকারখানা, নগর, বন্দর। ইস্পাত নগরী, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, নদী বাঁধ নির্মিত হল।দুরদর্শন এল ভারতে।

স্বাধীনতার ৭২ বছর

হারিয়েছি মাটির বাড়ি  পেয়েছি মাল্টিস্তরেদ বিল্ডিং, হাতপাখার পরিবর্তে এসেছে  এসি,কুলার।গ্রাম পড়ে রয়েছে অন্ধকারে। যদিও সরকারের সহায়তায় এখন গ্রাম গুলিতে পরিবর্তন হচ্ছে। ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে শৌচালয়, সৌর বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট,হাট বাজার।গনতান্ত্রিক অধিকার স্থাপিত হয়। স্বীকৃত হয় রাজনৈতিক অধিকার।তবে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নেই ভারত আজ বিব্রত। বিচিত্রের মাঝে যে ঐক্য, তা আজ স্বার্থবুদ্ধির নখরাঘতে চ্ছিন্নভিন্ন।সুতরাং জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠিত করাই স্বাধীন ভারতের উদ্দ্যেশ্য।

লেখিকা – শ্রেয়া মৈত্র চ্যাটার্জী 

Comments are closed.