শিবরাত্রি র ইতিহাস – The History Behind Shiva Raatri

ভুমিকা

ছোটবেলায় মা বলতেন শিবরাত্রি তে শিবলিঙ্গ এ জল ঢালো শিবের মত বর হবে।সত্যি কি কোনো মেয়ে অমন  ছাই ভস্ম মাখা,শ্মশান নিবাসী,ভাং সেবন করা,বাঘ ছাল পরিহিত,জটাধারী পুরুষ কে স্বামী হিসেবে চাইবে? উত্তর  টা হয়তো না হবে কিন্তু গোটা শ্রাবণ মাস ধরে বিশেষত সোমবার তারকেশ্বর বা শিবের থান গুলি র উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে যে মানুষ এর মনে এর জনপ্রিয়তা। শিবের মতন বর না হলেও শিব ভালো বর দিতে পারে এই ইচ্ছা য় আজও মেয়ে রা শিবরাত্রি পালন করে। ছেলে রাও উপোস করে,পূজো দেয় হয়তো দূর্গা র মত বউ পাবে বলে।শিব যখন দেবতা দের মধ্যে এতই  বিখ্যাত তখন জানাই যাক শিবের ইতিহাস,শিবরাত্রি র ইতিহাস।

মহাদেবের হাজারো রূপ

একাধারে তিনি পঞ্চানন, তাঁর পাঁচটি আনন বা মুখ, আর তিনটি নয়ন। যেটি  কপালে থাকে,সেই নয়নটি গ্যানের নয়ন।তিনি ব্রমহান্দের সৃষ্টি কর্তা,জীবের নিওয়ান্তা।তিনি স্বয়ম্ভু।তিনি আবার ধ্বংসে র অধিকর্তা।এঁর প্রধান অস্ত্র ত্রিশুল। মহাপ্রলয়ে কালে ইনি ডমরু বাজিয়ে ধ্বংসের সূচনা করেন।তিনি মহাযোগী সন্ন্যাসী,সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, নির্গুণ ধ্যানের প্রতীক।

মহা শিবরাত্রির ইতিহাস

অতি প্রাচীন কালে কাশী তে এক নিষ্ঠুর ব্যাধ থাকত ।একদিন শিকারে গিয়ে দেরি হওয়ায় সে সারা রাত একটি গাছে আশ্রয়ে নেয়।যে গাছ টি তে আশ্রয়ে নেয় সেটি ছিল বেল্গাছ।সে সারারাত ধরে কন শিকার না পেয়ে বেল গাছের একটা একটা করে পাতা ছিঁড়ে নীচে ফেলে ছিল।আর সেখানে ছিল একটি শিবলিঙ্গ।আর দিনটি ছিল মহা শিব্রাত্রি।ব্যাধ সারাদিন কিছু না খেয়েই ছিলেন।শিবের মাথায়ে বেলপাতা গুলি পরার ফলে অজান্তেই ব্যাধ সেদিন তার শিবরাত্রি র ব্রত পালন করে ছিল।পরে কিছু দিন পর তিনি মারা গেলে যমদূত রা তাকে নিয়ে আসে কিন্তু যেহেতু সে শিবরাত্রির ব্রত করে ছিল তাই যমরাজ তাকে মুক্তি দেন।এই হল শিব রাত্রি র ইতিহাস।

ব্যাখ্যা

হরপ্পা থেকে প্রাপ্ত একটি পুরুষ মূর্তি দেখে ঐতিহাসিক ব্যাসাম বলেছেন সেটি ছিল পশুপতি শিব।শিবের আরাধনা যে বহু প্রাচীন  বিষয়ে কম সন্দেহ নেই।বৈদিক যুগের প্রথমে শিব কে দেবতা রূপে আমরা পাইনা।কিন্তু তাঁর প্রতিরুপ রুদ্র কে ঋক বেদের একটি সুক্তে পাওয়া যায়। উত্তর বৈদিক সাহিত্যে সত্যম শিবম সুন্দরম পদ পাওয়া যায়। অথর্ব বেদে রুদ্র দেবতার সাত মুখ্য নাম পাওয়া যায়। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে তাকে মহেশ্বর নামে অভিহিত করা হয়েছে ।তিনি প্রকৃতি ও মায়ার অধিশ্বর।এই বিশ্ব ভুবন তাঁর ই  বিভিন্ন রূপ ও অবয়ব দ্বারা পরিব্যাপ্ত। পাণিনি ও পতঞ্জলি র মহাভাষ্যে স্কন্দ ও বিশাখার সাথে শিবের উল্লেখ পাওয়া যায়। বৌদ্ধ সাহিত্যেও শিবের উল্লেখ পাওয়া যায়। দীঘ নিকায় গ্রন্থে বেনহু ও ঈশানের নাম আছে। প্রথম টি বিষ্ণুর পালি রূপ দ্বিতীয় টি শিবের আরেক নাম। মিলিন্দপঞ্ছহ, জাতকাদি বৌদ্ধ গ্রন্থে শিবের নাম মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। ভারতের উত্তর, উত্তর পশ্চিম প্রান্তে শিব পুজার বিশেষ প্রচলন ছিল। আলেকজান্ডার ভারত অভিযানে বলেছিলেন পঞ্চনদ প্রদেশের একাংশে শিবি নামে এক জাতির লোক বাস করত।তারা সম্ভবত শিব পুজা করতেন। খ্রিস্ট পূর্ব যুগের এক গ্রীক ঐতিহাসিক হেক্যাতিয়স বলেন বৃষ অর্থাৎ শিবের বাহন গান্ধার প্রদেশের মানুষের উপাস্য দেবতা হিসাবে পুজিত হত। কুষান রাজ বিম কদফিসেস ও কনিস্কের মুদ্রাএ শিবের মনুষ্য মূর্তি খোদিত দেখা যায়। রামায়ন ও মহাভারত এ বহু অংশে শিবের পরিচয় পাওয়া যায় । একা ধারে তিনি রুদ্র, শিব ও মহাদেব, হর,ভব।এরপর আস্তে আস্তে শিব লিঙ্গ এর পূজো র চল শুরু হুয়। গোপীনাথ রাও মহাশয় শিবের আকৃতি সম্বলিত শিব লিঙ্গ অন্ধ্র প্রদেশের একটি গ্রাম থেকে উদ্ধার করেন।উজ্জয়িনী তে প্রাপ্ত একটি লেখবিহীন তাম্র মুদ্রায় শিবের মূর্তি  পাশে বাহন বৃষ এবং সামনে শিবলিঙ্গ মুর্তি ।শিবের মানবোচিত মূর্তি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত যথা উগ্র ও সৌম্য।এই দেবতার পুজা তামিল, তেলেগু, কানাড়ি প্রভৃতি ভাষাভাষী অঞ্চলে সুপ্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত ছিল।কারও কারও মতে শিব নামটি রক্তবর্ণ যা তামিল শব্দ শিব্বপ্পু থেকে গৃহীত ।দক্ষিনভারতে প্রচুর শিব মন্দির নির্মিত হয়।

শিবপূজার নিয়ম

শিব কে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান শিবরাত্রি হচ্ছে হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। শিব হলেন হিন্দুদের দেবদেবী দের মধ্যে সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবতা।এই শিবরাত্রি ফাল্গুন মাসে র কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথি তে এটি অনুষ্ঠিত হয়।ঐ দিন বাড়ির মা বোনেরা এমন কি অনেক পুরুষ রাও দুধ, গঙ্গাজল, মধু ,ফুল ,বেলপাতা সহযোগএ শিবলিঙ্গ পুজা করেন।

শিবরাত্রি ব্রত যারা  পালন করেন তারা শিবরাত্রির আগের দিন নিরামিস খাবার খান।আর ব্রতের দিন চার প্রহর উপবাসী থেকে রাত্রিবেলা শিব লিঙ্গে দুধ, দই, মধু, গঙ্গা জল ঢালেন।এই দিন প্রতিটি মন্দিরকেই সুন্দর করে সাজানো হয়।লিঙ্গ গুলিকে আকন্দ, অপরাজিতা বেলপাতা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো হয়।মহাশিব রাত্রির রাতে ভারতে র বারটি জ্যোতির লিঙ্গ তথা সোমনাথ,  মল্লিকারজুন, মহাকালেশ্বর, অঙ্কারেশ্বর,কেদারনাথ, ভিমশঙ্কর,বিশ্বেশ্বর,ত্র্যম্বকেশ্বর, বৈদ্যনাথ, নাগেশ্বর, রামেশ্বর,ঘুশ্মেশ্বর সেজে ওঠে।

শিব পুজায় শিব লিঙ্গকে গঙ্গাজল ,দুধ, মধু, দিয়ে স্নান করানো হয়।তারপর একটি ডাটিতে তিনটি পাতা আছে এমন পাতা দিয়ে সাজানো হয়।

শিব পুজার ফল

এই ব্রত পালন করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ এই চার রকম ফল পাওয়া যেতে পারে।

শেষ কথা

কি ভাবছেন পড়ে? এই ব্রত পালন করতে মন চাইছে? তবে আর সাত পাঁচ না ভেবে করে দেখতে পারেন।আপনার ঠাকুর ঘরের শিব বা মন্দিরে র শিবের মাথায়ে জল ঢেলে পুণ্য অর্জনের সুযোগ মিস নাই বা করলেন।কে বলতে পারে আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হতেই পারে।

লেখিকা – শ্রেয়া মৈত্র চ্যাটার্জী 

Comments are closed.