ত্বকের যত্নের রকমারি – Skin Care in Bengali

প্রত্যেক মানুষের আলাদা আলাদা স্কিন এর কোয়ালিটি। নানা রকম মানুষ, নানা রকম ত্বক। কারোর সাধারণ, কারোর শুষ্ক আবার কারো বা তৈলাক্ত। ত্বক যেমন ভিন্ন, এর যত্নও তাই হওয়া চাই বিভিন্ন। এক রকম ত্বকের যত্ন আরেক রকম হলে হতে পারে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া। সুন্দর থাকার ইচ্ছে কার না হয়। কিন্তু উপায় নেই যে! রোজকার অফিস-সংসার ইত্যাদির ঠেলায় জীবন জেরবার। নিঃশ্বাস নেওয়ারই ফুরসৎ নেই, তো রূপচর্চার! মানছি কথাটা সত্যি। আজকাল সকলের জীবনেই সময়ের এত অভাব, যে সবদিক সামলে নিজের জন্য আর সময় বাঁচে না। সেখানে ফর্দ ধরে রূপচর্চা করতে বসা অনেকের কাছেই সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু না। সমস্যাটা এখানেই। আসল কথাটা হল ইচ্ছে। সারা সপ্তাহ না হয় ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু উইকএন্ডের একটা দিনের কয়েকটা ঘণ্টা সময় সকলেরই হাতে থাকে। যদি বলি ওইটুকু সময়ই যথেষ্ট? তাহলে তো আর সময়ের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে হাত-পা ঝেড়ে ফেলার উপায় নেই। বাড়িতে বিরিয়ানি কিংবা কোর্মা-কালিয়া খেতে ইচ্ছে হলে তা যেমন সপ্তাহান্তের জন্য তুলে রাখেন, তেমনই রূপচর্চার জটিল রেসিপিগুলোও সপ্তাহান্তের জন্য তুলে রাখুন। সপ্তাহের শেষে চুল এবং ত্বকেরও তো একটু আদর প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পদ্ধতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই বুদ্ধি করে সময়টা খরচ করাটাও দরকার। একদিন একটু সময় করেও যদি যত্ন নেন, দেখবেন এক সপ্তাহের সব সমস্যা ওই একদিনের যত্নেই মিটে গেছে।আসুন যেনে নিই ত্বকের ধরণ অনুযায়ী এর যত্নের কিছু নমুনা। মোটামুটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ধরণের ত্বক দেখা যায়। তাহলে চলুন ভিন্ন ভিন্ন ত্বক অনুযায়ী আমাদের ত্বকের যত্নের কিছু সমসাধারণ টিপস।

1. স্বাভাবিক ত্বক বা নরমাল স্কিন

ত্বক স্বাভাবিক হলে সমস্যাও অনেক কম হয়। ত্বকের যত্ন না হলে ত্বকের স্বাস্থ্য হানি ঘটে ও জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়।

1. গায়ে মাখা সাবান দিয়ে ত্বক পরিস্কার করুন। বেসনও ব্যবহার করতে পারেন। ২/৩ চামচ বেসন গুলে সারাগায়ে মেখে পরে জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন।

2. প্রথমে অল্প গরম জলের ঝাপটা দিয়ে শরীর ধুয়ে তারপর ঠান্ডা জল দিয়ে স্নান করুন।

3. মুখ হালকা গরম জল দিয়ে মুছে ঠান্ডাজল দিয়ে  গা-সহা ঝাপটা দিন।

4. দিনে অন্তত ৫/৬ বার মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দেবেন। এতে ত্বকের পরিচ্ছন্নতা ছাড়াও শরীর ঝরঝরে লাগে।

5. জল ছাড়া মাঝে মাঝে প্রচলিত কোম্পানীর ক্লিনজিং মিল্ক বা ক্লিনজিং লোশন দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করবেন। ক্লিনজিং মিল্ক ব্যবহারে ত্বকের ময়লা উঠে আসে। হালকা ভাবে তুলো বুলিয়ে নেবেন।

6. মুখের ত্বক পরিষ্কার করার পর ফ্রেশনার বা স্কিন টণিক লাগাতে পারেন। অথবা ঘরোয়া রুপটানে আলু থেঁতো, শশার চাকা, পাতিলেবুর রস প্রভৃতিতেও ভালো কাজ হয়।

7. পরিষ্কার করা মুখে ময়শ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করবেন। তাতে মুখের আদ্রতা থাকে বা চলে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনে।

8. সপ্তাহে একদিন হালকা গরম জলে লবণ দিয়ে তোয়ালে ভিজিয়ে আলতো করে ঘষে মুখে, কানের পাশে, ঘাড়ে, গলার মরা চামড়া ভালো করে তুলে দিন। যেদিন এভাবে করবেন সেদিন আর ময়শ্চারাইজিং লোশন ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

9. সপ্তাহে এক দিন অন্ততঃ মুখে গরম জলের ভাব দেবেন। হালকা গরম জলে কয়েক টি তুলসী পাতা দিয়ে নেবেন। গামলার জলের কাছাকাছি মুখ নিয়ে তোয়ালে দিয়ে মাথা ঢেকে নেবেন দেখবেন মুখেই যেন শুধু ভাপ লাগে। ভাপ নেওয়া ভাল,এতে লোমকূপের নোংরা পরিষ্কার হয়ে,ব্রণ হওয়া কমে যায়।পাঁচ মিনিটের বেশি ভাপ নেওয়ার দরকার নেই।

10. যাদের ত্ত্বক স্বাভাবিক তারা সপ্তাহে দু’দিন ফেস-প্যাক লাগাবেন। বাড়িতে নানা রকম ফেস-প্যাক তৈরি করে নিতে পারেন যেমন ডিমের কুসুম আর অলিভ অয়েল মিশিয়ে মেখে পরে ঠান্ডা জলে ধুয়ে নেবেন। ফেস-প্যাক এর ব্যবহারে ত্ত্বক উজ্জ্বল হয়।

11. রাতে শুতে যাবার সময় যে কোনো ঋতুতে মুখ,হাত,পা ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে মুছে ক্রীম মাখবেন।

12. মেকআপ করার আগে এস্ট্রিনজেন্ট লোশন লাগানো ভালো।

2. মিশ্র ত্বক

মিশ্র ত্বকে মুখমন্ডলের কিছু অংশ বেশি তৈলাক্ত হয়। সেজন্য এই জাতীয় ত্বকে কোন অংশ কি রকম তা বুঝে তবেই পরিচর্যা করা ভালো। মোটামুটি স্বাভাবিক ত্বকের মতই যত্ন নিন। তবে যে অংশগুলো বেশি তৈলাক্ত সেখানে মাঝে মাঝে এস্ট্রিনজেন্ট লোশন লাগিয়ে নিতে পারেন। তৈলাক্ত অংশে ডিমের সাদা অংশ এবং বাকি অংশে ডিমের কুসুম ও অলিভ অয়েলের ঘরোয়া ফেস-প্যাক ব্যবহার করুন, এটা উপকারী।

3. তৈলাক্তত্বক

তৈলাক্ত ত্বক আসলে স্বাস্থ্যকর ত্বক। এই ত্বকে বয়সের ছাপ সহজে বোঝা যায় না। সর্বদাই তেলতেলে থাকে বলে মেক-আপের অসুবিধে হয় তবে মুখ পরিস্কার না রাখলে ব্রণ দেখা দেয়। কাজেই রোজ দু’বেলাই ত্বক পরিচর্যা করবেন।

1. সারা দিনে যত বেশিবার সম্ভব মুখ ধোওয়া ভাল।

2. মুখে চন্দন বা লেবুযুক্ত সাবানের ফেনা ভাল করে মাখিয়ে নেবেন। প্রথমে হালকা গরম জলে মুখ ধুয়ে নেবেন বা বেসন দিয়ে মুখ পরিস্কার করাও ভাল। ক্লিনজিং মিল্ক ভাল করে মালিশ করে তুলা বা টিসু পেপার দিয়ে মুছে নেবেন।

3. গ্রীষ্মকালে রোজ দুবার করে এস্ট্রিনজেন্ট লোশান লাগাবেন। এতে শরীরের বাড়তি তেল রোধ হয়। ঘরোয়া পদ্ধতিতে আলু থেঁতো, শশা,  পাতিলেবুর রস প্রভৃতি সকালের দিকে লাগাতে পারেন।

৪। রোজ একবার ভাল ময়শ্চারাইজিং লোশন গলায়, ঘাড়ে, মুখে মাখুন।

5. সপ্তাহে তিনদিন মুখে ফেস-প্যাক লাগান। ডিমের সাদা অংশ ভাল করে ফেটিয়ে নিয়ে তাতে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে বিশ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। চোখের ওপর ভিজে তুলা চাপা দিয়ে রাখুন যাতে চোখের কোণে এই মিশ্রণ না লাগে। পরে জলেরঝাপটা দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

6. সপ্তাহে অন্ততঃ ১বার গরম জলের ভাপ নিন।

4.শুষ্ক ত্বক

শুষ্ক ত্বক পাতলা ধরনের হয় সেইজন্য তাড়াতাড়ি বলিরেখা পড়ে, কুঁচকে যায়। এই জাতীয় ত্বকের যত্ন নিতে হয় খুব সাবধানে।

1. সকালে, সন্ধ্যায়, রাত্রে মুখ ভাল করে ধোবেন। একবার উষ্ণ গরম জল পরে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দেবেন।

2. ময়শ্চারাইজিং লোশন লাগিয়ে ভাল করে তুলা দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন।

3. ফ্রেশনিং করার জন্য রোজ ভাল কোম্পানীর স্কিন টনিক বা লোশন ব্যবহার করবেন। নরম তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিন। আলু থেঁতো বা শশা দিয়ে ফ্রেশনিং করলে চামড়ার ঔজ্জ্বল্য বাড়ে।

4. ডিমের কুসুমের সঙ্গে অলিভ অয়েল মিশিয়ে সপ্তাহে ফেস-প্যাক নেবেন। আধঘন্টা চিত হয়ে শুয়ে থাকবেন । তারপর ঠান্ডা জলে  মুখ ভাল করে ধুয়ে নেবেন।

5. মাসে দুবার ভাপ নেবেন। গরম পানিতে তুলসী পাতা দিয়ে।

শেষ কথা 

সুন্দর এবং ঝরঝরে থাকতে হলে পর্যাপ্ত ঘুম খুব দরকার। সারা সপ্তাহ নানা ব্যস্ততার মধ্যে যদি ঘুমের ঘাটতি থেকে যায়, সেক্ষেত্রে সপ্তাহ শেষে তা পুরণ করে নেবার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি রিল্যাক্স থাকতে চেষ্টা করুন। ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করতে পারেন। স্নানের জলে এককাপ এপসম সল্ট এবং কয়েক ফোঁটা ল্যাভেন্ডার এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে স্নান করুন। আরাম পাবেন। তবে ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করলে শরীরের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার ঘাটতি দেখা দিতে পারে, বিশেষত শীতকালে। তাই স্নানের আগে (গরমকালে) কিংবা পরে (শীতকালে) শরীরে নারকেল তেল মাসাজ করুন।আশা করা যায় এই জিনিস গুলো ঠিকঠাক করতে পারলে আপনার ত্বক অনেকটাই সুস্থ ও সবল থাকবে। ধন্যবাদ ভালো থাকবেন। একবার পোস্টটি শেয়ার করে দিন।

লেখক – শান্তনু পাল 



Comments are closed.