কার্তিক পুজোর কড়চা

কার্তিক পূজা হিন্দুদের একটি পুজো। কার্তিক হল হিন্দু যুদ্ধদেবতা।  তিনি দেবাদিদেব মহাদেব  শিব ও দশভুজা  দুর্গার সন্তান। কার্তিক বৈদিক দেবতা নন; তিনি পৌরাণিক দেবতা। প্রাচীন ভারতে সর্বত্র কার্তিক পূজা প্রচলিত ছিল। উত্তর ভারতে ইনি এক প্রাচীন দেবতা রূপে পরিচিত । অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর মতো কার্তিকও একাধিক নামে অভিহিত হন। যেমন – কৃত্তিকাসুত, আম্বিকেয়, নমুচি, স্কন্দ, শিখিধ্বজ, অগ্নিজ, বাহুলেয়, ক্রৌঞ্চারতি, শরজ, তারকারি, শক্তিপাণি, বিশাখ, ষড়ানন, গুহ, ষান্মাতুর, কুমার, সৌরসেন, দেবসেনাপতি ইত্যাদি।ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে কার্তিকের পূজা অধিক জনপ্রিয়। দক্ষিণ ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও মরিশাস – যেখানে যেখানে তামিল জাতিগোষ্ঠীর প্রভাব বিদ্যমান সেখানেই মুরুগানের পূজা অর্থাৎ আমাদের কার্তিক পূজা  প্রচলিত।  বাংলায় কার্তিক সংক্রান্তির দিন বা সেই সময়ে কার্তিক পূজার আয়োজন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়া-বাঁশবেড়িয়া কাটোয়া ও আরও অনেক পার্শবর্তী অঞ্চলে কার্তিক পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ। এছাড়া বাংলার গণিকা সমাজে কার্তিক পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। দুর্গাপূজা সময়ও কার্তিকের পূজা করা হয়। কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। সারা বছর ধরেই নানারকমের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠান লেগেই রয়েছে।আমরা অনেক পূজা সম্পর্কে ভাল করে জানি না। আসুন জেনে নিই কার্তিক পূজার ইতিবৃত্তান্ত। জেনে নিন কার্তিক ঠাকুর সম্পর্কে দু-চার কথা।

কার্তিক ঠাকুর কে 

কেউ তাঁকেে বলে স্কন্দ, কেউ বলে মুরুগন আবার কেউ ডাকে সুব্রহ্মণ্য বলে। তিনি আসলে দেব সেনাপতি, যুদ্ধের দেবতা । আমাদের কাছে জনপ্রিয় কার্তিকেয় বা কার্তিক নামে, শিব ও পার্বতীর পুত্র রূপে। দেবলোকে যেখানেই যুদ্ধ হয় সেখানেই কার্তিকের ডাক পড়ে। পুরাণ অনুসারে হলুদবর্ণের কার্তিকের ছটি মাথা। তাই তাঁর অপর নাম ষড়ানন। যুদ্ধের দেবতা বলে নাকি তাঁর ছটি মাথা। চারিদিক থেকে তাঁর লক্ষ্য অবিচল। পাঁচটি ইন্দ্রিয় অর্থাত চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক ছাড়াও একাগ্র মন দিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। । তাঁর হাতে থাকে বর্শা-তীর-ধনুক। আবার কারো মতে মানব জীবনের ষড়রিপু- কাম(কামনা), ক্রোধ (রাগ), লোভ(লালসা),মদ(অহং), মোহ (আবেগ), মাত্সর্য্য (ঈর্ষা)কে সংবরণ করে দেব সেনাপতি কার্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সদা সজাগ থাকেন। এই ষড়রিপু মানুষের জীবনের অগ্রগতির বাধা তাই জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করতে গেলেও কার্তিকের মত সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। পুরাণমতে তিনি তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে । তাই মাদুর্গার যুদ্ধযাত্রায় এমন শৌর্যবীর্য সম্পন্ন পুত্র সঙ্গী না হয়ে যায় কোথায় ! কোনো কোনো মতে রণ-দেবতা কার্তিক হলেন চিরকুমার ব্রহ্মচারী। আবার কোনো কোনো পুরাণ মতে কার্তিকের পত্নী হলেন ইন্দ্রের কন্যা দেবসেনা বা লক্ষ্মীরূপিণী ষষ্ঠী। 

আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে কার্তিক ঠাকুর পুজো নিয়ে খুব বেশি হইহুল্লোড় হয় না। দুর্গাপুজোর পরেপরেই কিছুদিনের মধ্যেই কার্তিকমাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকের পুজো। কোন কোন প্রাচীন পরিবারে ধারাবাহিকভাবে, এবং এক-দুটি বিশেষ অঞ্চলে খুব হইচই করে এই পুজো হয়; কিন্তু সর্বজনীন পুজো হিসাবে কার্তিকপুজো বাঙালি সমাজে এখন আর সেরকম জনপ্রিয় নয়।  সেই কমে আসা উৎসাহ থেকেই সম্ভবতঃ মুখে মুখে তৈরি হয়েছে এই ছড়া –

“কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা,

একবার আসেন মায়ের সাথে,

একবার আসেন একলা।”

এটা কিন্তু খুব অন্যায়। একলা কার্তিকই খালি দুবার আসেন নাকি? মা-দুর্গার বাকি ছেলেমেয়েরাও কি আলাদা করে আরেকবার আসেন না? হ্যা আসেন তো। সরস্বতী, গনেশ ও লক্ষী এরা সবাই তো আলাদা আলাদা করেও আসেন। 

ময়ূর কোনো বাহন 

অষ্টম শতকের ভাস্কর্য কার্তিকের বাহন আলস্যবিহীন ময়ুর । ময়ূরের পায়ে একটি সাপ অর্থাত অহংবোধ ও কামনা বাসনা বলি দিয়ে তিনি যুদ্ধ করতে ব্যস্ত। ময়ূর অত্যন্ত সজাগ এবং কর্মচঞ্চল পাখী । সৈনিক কার্তিকের সবগুণগুলি সে বহন করে । তাই কার্তিকের বাহন ময়ূর। 

নাম কার্তিক কেন 

কৃত্তিকা নক্ষত্রে তাঁর জন্ম হয়েছিল এবং ছয় কৃত্তিকার দ্বারা তিনি পুত্ররূপে গৃহীত ও প্রতিপালিত হন বলে তাঁর নাম কার্তিকেয় বা কার্তিক। তাঁর আরো অনেক নাম আছে যেমন গুহ, পাবকি, মহাসেন, ষন্মুখ,কুমার, কুমারেশ, গাঙ্গেয়, বিশাখ, মহাসেন, কুক্কুটধ্বজ, নৈগমেয়।

কোনো আমরা কার্তিকের পূজা করি 

ব্রহ্মার বরে মহাবলী তারকাসুরের নিধনের জন্যই নাকি অমিত বিক্রম যোদ্ধা কার্তিকের জন্ম হয়েছিল। কেউ বধ করতে পারছিলনা তারকাসুরকে। তার অত্যাচারে দেবকুল অতিষ্ঠ । আর দৈববলে অজেয় শক্তি সম্পন্ন এই দেবশিশু কার্তিকেয় তারকাসুর নিধন করেছিলেন । আর এই তারকাসুর নিধন করে দেবকুলে কার্তিক গেলেন দেবসেনাপতি। তাই কার্তিকের পুজো হয় মহাসমারোহে। দেবতারূপে কার্তিক একসময়ে সারা ভারতীয় উপমহাদেশেই খুব জনপ্রিয় ছিলেন। ভারতীয় পুরাণগুলির মধ্যে স্কন্দ পুরাণে কার্তিকের বিষয়ে সবিস্তারে লেখা আছে। তাছাড়াও মহাভারতে এবং সঙ্গম তামিল সাহিত্যে কার্তিকের নানা বর্ণনা রয়েছে। 

কার্তিকের কিছু অজানা কথা বা জীবনী সম্পর্কে 

লা হয়ে থাকে কার্তিক চিরকুমার ৷ কিন্তু পুরাণ, লোককথা, কালিদাসের কাব্য থেকে এক ভিন্ন কথা শোনা যায়৷ সেখানে এমন উপাখ্যানও রয়েছে যাতে বলা হচ্ছে কার্তিকের জীবনে অধিষ্ঠান করছে দুই পত্নী – দেবসেনা এবং বল্লী৷ দেবসেনার কথা উত্তর ভারতে কিছুটা প্রচলিত হলেও বল্লীর সঙ্গে কার্তিকের বিয়ের কাহিনি অবশ্য উত্তর ভারতে তেমন প্রচলিত নয় এই কাহিনি মূলত দক্ষিণ ভারতেই জনপ্রিয়৷

জন্মসূত্রে পিতা শিবের বীর্য ও গুণাবলীর যেমন তিনি উত্তরাধিকারী হন, তেমনি মাতা পার্বতীর শৌর্য ও বীর্যের উত্তরাধিকারও তিনি লাভ করেন। তাঁর অপ্রতিরোধ্য পরাক্রম ও দুর্জয় সাহস তাঁকে এনে দেয় দেব-সেনাপতির স্বীকৃতি। রামায়ণ, মহাভারত এবং প্রধান পুরাণগুলিতে কার্ত্তিকের জন্মকথা ও কীর্তি কাহিনি সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে।

কার্তিকের জন্ম ও কিছু বিশেষ তথ্য 

কার্তিকের জন্ম অমাবস্যা তিথিতে। পরবর্তী পাঁচদিনে তাঁর প্রাপ্তবয়স্কতা লাভ। ষষ্ঠদিনে তাঁর দেবসেনাপতিত্বে অভিষেক এবং দেবসেনার আধিপত্য লাভ, যুদ্ধাভিমান ও বিজয়।শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতেই দেবসেনার সঙ্গে কার্ত্তিকের বিবাহ। একমতে তাঁর পত্নী ‘দেবসেনা’ হলেন ব্রহ্মার কন্যা। মতান্তরে তিনি আবার ইন্দ্রের কন্যা ৷ তারকাসুরকে বধ করেছিলেন কার্তিক। তখন কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ইন্দ্র তাঁর মেয়ে দেবসেনার সঙ্গে বিয়ে দিলেন শিবপুত্রের কারণ তারকাসুর দেবতাদের পরাজিত করে সে স্বর্গলোক অধিকার করেছিল। দেখা যায় বিভিন্ন পুরাণেই কথিত রয়েছে দেবতা ও অসুরদের প্রচণ্ড সংগ্রাম এবং দেবতাদের পরাজয়ের পটভূমিকায় শিব-পার্বতীর পুত্ররূপে কার্ত্তিকের জন্ম হয়েছিল। আবার কার্ত্তিকের জন্ম-উপাখ্যানটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কার্ত্তিকের জন্মের পিছনে ছিল শিব-পার্বতীর কঠোর তপস্যা। সন্তান আসবে পিতা-মাতার সংযম ও তপস্যার সেতুপথে-এটাই প্রাচীন ভারতীয় দাম্পত্য জীবনের মূল দর্শন। কাত্তির্কের স্ত্রীর নাম দেবসেনা। সেকারণেও তিনি ‘দেবসেনাপতি’ আবার দেবসেনাবাহিনীর নায়কত্বের জন্য ও তিনি ‘দেবসেনাপতি’ নামে পরিচিত।

বৈবাহিক জীবন 

বিয়ের পর স্ত্রী দেবসেনার সঙ্গে নিয়ে কৈলাসে বসবাস শুরু করেন কার্তিক। মা, বাবা আর ভাই গণেশের সঙ্গে সুখে দিন কাটছিল। কিন্তু, ভাই গণেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখে পড়তে হল কার্তিককে৷ প্রতিযোগিতার বিষয় – দুই ভায়ের মধ্যে কে আগে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারবে৷ তা শুনে বাহন ময়ূরে চড়ে সারা পৃথিবী ঘুরতে বেড়িয়ে পড়েন কার্তিক৷ কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন তার আগেই বিজয়ীর সম্মান পেয়ে গিয়েছেন গণেশ কারণ তিনি বাবা-মাকেই পৃথিবীজ্ঞানে তাঁদের প্রদক্ষিণ করে এই কাজটি সেরেফেলেছেন। সকলেই প্রশংসা করছেন তাঁর বুদ্ধির৷ এরপর একরাশ অভিমান নিয়ে কৈলাস ত্যাগ করে স্ত্রী দেবসেনাকে সঙ্গে নিয়ে কার্তিক চলে আসেন দক্ষিণ ভারতে। সেখানকার উপজাতি তাঁকে বরণ করে নেয় এবং ময়ূরবাহন বা মুরুগন বলে শ্রদ্ধা জানায়৷ এই সময়ে একদিন সেখানকার ক্ষেতে একটি কালো মেয়েকে দেখে আকৃষ্ট হন৷ মেয়েটি হল স্থানীয় উপজাতি রাজার মেয়ে বল্লী৷ তখন কার্তিক বল্লীর মন জয় করতে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে বিফল হলে গণেশ দাদাকেই স্মরণ করেন। ভাইয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে গণেশ এক পাগলা হাতির রূপ ধরে এসে বল্লীর পথ আটকালেন৷ তখন ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে বৃদ্ধরূপী কার্তিকেই জড়িয়ে ধরেন বল্লী। তখন কার্তিক ওই মেয়েটির কাছে প্রতিশ্রুতি আদায় করলেন- হাতিটাকে তাড়াতে পারলে বল্লী তাঁকে বিয়ে করবে৷ এরপর ভয় কাটিয়ে চোখ খুললে বল্লী অবশ্য দেখতে পান সুদর্শন যুবক কার্তিককে৷ তারপরে বিয়ে হয় তাদের। 

বাঙালি মতানুযায়ী কার্তিক পূজা করার  আরও একটি মজার নিয়ম 

আমাদের বাঙালিদেড় মোতে কার্তিককে অনেকেই সন্তান রুপি মনে করি। অর্থাৎ একটু বিশ্লেষণ করে যদি বলি তাহলে, – কারণ যদি সন্তান না থাকে বা সন্তান না হয়, বা সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে বা বিয়ের এক বছর হয়ে গাছে তাদেরকে পাড়ার বা বাড়ির আসে পাশের লোকরা বা বন্ধু বান্ধবরা মজা করে রাতের বেলায় সেই দাম্পত্য পরিবাররা যখন ঘুমিয়ে পরে তারপর তার বাড়ির গাঁটের সামনে বা দরজার সামনে একটা কার্তিক ঠাকুর রেখে আসে মুখটা থাকে পেপার দিয়ে মোরানো।  আর সেই কার্তিক ঠাকুরের গায়ে একটা কাগজ এ তার দাম লেখা থাকে এবং কোথায় আছে যে যেই দাম তা লেখা থাকে সেই দম্পত্তিকে সেই দাম তাই দিতে হয় পরে। এটা একটা মজার ঘটনা হয়ে থাকে কার্তিক মাসে কার্তিক পুজোর সময়ে।

শেষ কথা 

হ্যা আমাদের ভারতীয় মতানুযায়ী ও স্পেশালি বাঙালিদের মতানুযায়ী কার্তিক ঠাকুরকে সন্তানরূপ বলে মনে করা হয়। কার্তিক মাসে কার্তিক পুজো প্রায় মোটামুটি সব ঘরে ঘরে হয়ে থাকে।  তবে লক্ষী পুজোর মতন অটো জাগে জমগ করে না হলেও মোটামুটি খুউব একটা খারাপও হয় না। বেশির ভাগ সন্তানহীন, সদ্য বিবাহ দাম্পত্য, ইত্যাদি পরিবারের মানুষরা এই পুজো করে থাকে। বাড়ি বাড়ি মজা করে বকাটে ছোড়ারাও  কার্তিক ফেলার জন্য আগের দিন থেকেই প্রস্তুত থাকে।  যার বাড়িতে কার্তিক ফেলবে বা রেখে আসবে তাদের শুধু ঘুমানোর জুন অপেক্ষা করে থাকে আর যেই ঘুমিয়ে পরে অমনি কার্তিক ফেলার বা রাখার ধুম চলে তোর জোর।


Comments are closed.