বাতের ব্যাথার চিকিৎসা – Home Remedies for Gout

মাঝে মাঝে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা তিথির সন্ধ্যেবেলা আমাদের বাড়ির মা ঠাকুমারা একটা কথা বলেন তাদের পায়ের গাঁট গুলি ফুলে গিয়েছে এবং তার ফলে তাদের অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। এটিই হল গেঁটে বাতের ব্যাথার ফল। তা কেন তাঁদের এই ব্যাথা পূর্ণিমা বা অমাবস্যার দিনেই হত সে উত্তর অনুসন্ধানে না গিয়ে চলুন জেনে নিই বাত বা গেঁটে বাত আসলে কি।

বাতের ব্যাথার চিকিৎসা – Home Remedies for Chronic Pain

আমাদের দেশে মজা করে বলা হয়, বাত রোগটি আমাদের শরীরের অবস্থা যেমন বলে দেয় তেমনই আমাদের পকেটের অবস্থার কথাও জানান দেয়। অপুষ্টিতে ভোগা কোনো লোকেরই বাতের সমস্যা থাকে না। বাত সাধারণত দুই রকমের হয়ে থাকে-

1. প্রাইমারি গাউট-

এই রোগ প্রধানত ৪০ বছরের বেশি বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়। প্রদাহজনিত কারণই এই রোগের মূল কারণ।

2. সেকেন্ডারী গাউট-

এই রোগ প্রধানত কিডনির বিকলতার ফলে হয়ে থাকে। ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকেও এই রোগ হয়ে থাকে।

উপসর্গ-

গেঁটে বাতের উপসর্গ প্রথমেই তীব্র ভাবে প্রকাশ পায় না । বাত মূলত শরীরের জয়েন্ট গুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যার ফলে শরীরের সেই সব অংশগুলি ফুলে যায় এবং লাল হয়ে যায়। সেই সকল অংশে প্রদাহের সৃষ্টি হয়। এই ব্যাথা সাধারণত প্রকাশ পাওয়ার ২-৬ ঘণ্টার মধ্যে এই ব্যাথা তীব্র রূপ নেয়। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর এই ব্যাথা অনুভূত হয়। প্রধানত বুড়ো আঙুল , হাঁটুতে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সেই সময় একে পেডাগ্রা বলা হয়। এছাড়াও যে জয়েন্ট গুলিতে এই রোগ দেখা যায় তারা হল-  গোড়ালির জয়েন্ট, মধ্য পায়ের জয়েন্ট, কব্জির জয়েন্ট, কনুইয়ের জয়েন্ট, ছোট ছোট হাঁটুর জয়েন্ট নানান জায়গাতে এই ব্যাথা অনুভূত হয়। ৫-১০ দিনের মধ্যে এই ব্যাথা প্রশমিত ব্যাথা। অনেক সময় নানান জয়েন্টের ব্যাথা বাত বলে মনে হতেই পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে নিজের রোগ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কারণ-

শরীরে দিনের পর দিন ইউরিক অ্যাসিড জমতে থাকলে বাতের  ব্যথা হয়। ইউরিক অ্যাসিড আমাদের দেহের একটি বিপাকজাত পদার্থ। এই ইউরিক অ্যাসিড দেহের খাঁজ বা জয়েন্ট গুলিতে জমতে জমতে থাকে, এবং ক্রিস্টালের আকার নেয়। সেই সূচের মতো ক্রিস্টাল গুলোই ব্যাথার কারণ হয়।  তবে শরীরের ভেতর ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়লেই যে গেঁটে বাত হবে তার কোনো মানে নেই। এর ফলে কিডনিতে স্টোনও হতে পারে।

শরীরে ইউরিক অ্যাসিড জমা হওয়ার কিছু নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।
সেগুলি হল
1. দৈনন্দিন খাদ্যতালিকাতে যদি রেড মিট থাকে, কচু, মটরশুটি, মাশরুম, মাছের ডিম, লাল পুঁই শাক ইত্যাদি খাদ্য থাকলে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়।
2. দীর্ঘদিন ধরে অ্যালকোহল গ্রহণ করলে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ে।
3. শরীর মেদহীন করবার জন্য ডায়েট করলে শরীর হালকা হয়ে যাওয়ার পর শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়ে।
4. উপোস করার অভ্যাস এই ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
5. কিডনিতে সমস্যা থাকলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়।
6.  এই রোগ বংশানুক্রমে দেখা যায়।

পরীক্ষা নিরীক্ষা-

অধিক মাত্রায় রক্তে ইউরিক অ্যাসিড জমলে বাতের কারণ ঘটতে পারে। কিন্তু এই ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাই একমাত্র কারণ নয়। এছাড়াও নানান কারণ পরিলক্ষিত হয়। ইউরিক অ্যাসিডের আধিক্যই যে একমাত্র প্রমাণ তা নয়। ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ রক্তে কম থাকলেও বাতের সমস্যা দেখা যায়।
তাই ডাক্তারবাবু রোগ নিরীক্ষণের জন্য রক্তের পরীক্ষার কথা বলেন। এছাড়াও –

1. ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাবে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ এছাড়াও কিডনির নানান রকম সমস্যার কথা জানা যায় এমন স্বাভাবিক পরীক্ষা সমূহের মাধ্যমে বাতের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়ে থাকে।  
2. শরীরের গাঁট গুলির এক্স রে পদ্ধতিতে বাত নির্ণয় করা হয়।
3. প্রাথমিক গাউটের ক্ষেত্রে শরীরে অভূক্ত অবস্থায় লাইপ্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়।
4. রক্তে ইএসআরের মাত্রা বৃদ্ধি হলে টোফইয়াস গাউট দেখা যায়।

চিকিৎসা-

1. হঠাৎ আক্রান্ত বাতের ক্ষেত্রে
A. দ্রুত কার্যক্ষম ননস্টেরয়ডাল অ্যান্টিইনফ্লামেটারী ড্রাগ ব্যাথা নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যেমন-  ন্যাপ্রক্সেন, ডাইফ্লেনাক ইত্যাদি
B. হঠাৎ উদ্ভূত ব্যাথার ক্ষেত্রে ওরাল কলচিসিনও বিশেষ ভূমিকা রাখে কিন্তু এক্ষেত্রে ডায়েরিয়া, বমি বমি ভাবের মতো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
C.তীব্র ব্যাথার সময় সিরিঞ্জ দিয়ে তরল বের করে আনলে রোগী কিছুটা আরাম পান। এছাড়া ব্যাপক হলে ব্যাথার মাত্রা বেড়ে গেলে স্টেরয়েড ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়।

2. দীরঘস্থায়ী ব্যাথার ক্ষেত্রে- দীর্ঘস্থায়ী ব্যাথার ক্ষেত্রে রোগীকে ওষুধের থেকেও জরুরি হয়ে পড়ে কিছু পরামর্শ দেওয়া এবং কিছু খাদ্যাভাসের পরিবর্তন রোগীকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও নানান ড্রাগ দেওয়া হয়।এক্ষেত্রে চিকিৎসকের নজরে থাকা খুবই জরুরি।   
A. অ্যালপুরিনল- প্রারম্ভিক মাত্রা হল ১০০- ৩০০ মিলিগ্রাম। তবে কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে তা কম হবে। মাত্রা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। মাত্রা কমানোর পাশাপাশি ওরাল কলিচিসিন ০.৫ মিলগ্রাম করে ১২ ঘণ্টা পর পর চালিয়ে যেতে হবে ।
B. প্রোবিনেসিড-  ০.৫ মিলিগ্রাম থেকে ১ মিলিগ্রাম ১২ঘন্টা পর পর অথবা সালফার পাইরোজেন ১০০ মিলিগ্রাম ৮ ঘণ্টা পর পর।

সতর্কতা এবং পরামর্শ-


প্রথমেই বলা হয়েছিল এই রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা সতর্কতা, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা।
1. তেল  মশালা যুক্ত খাবার ত্যাগ করা।
2. অ্যালকোহল পরিত্যাগ করা।
3. ডায়েটের নামে সব খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেওয়া এবং দীর্ঘসময় উপোষ না করা।
4. নিয়মিত ব্যায়াম করা।

তাই সুস্থ থাকুন নিয়মিত পরিমিত আহার করুন। আর বাতের ব্যাথা থেকে মুক্তি পান সহজে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন নিয়মিত  

লেখক – রাহুল পাঠক 


Comments are closed.