গর্ভাবস্থার খাওয়া দাওয়া – Diet for Pregnancy

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। মানুষ আজ পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী জীব। এই জীব নিজের বংশবিস্তার করে আর পাঁচটা স্তন্যপায়ী জীবের মতোই। মাতৃত্বের অনুভূতি নিয়ে সারা দুনিয়াতেই আলোচনা হয়েছে, হয়েও চলেছে। একটা জীব যখন নিজের দেহের ভিতরে বেড়ে ওঠে তার অনুভূতি দেশ কাল সীমান্তভেদে একইরকম। সে অনুভূতি স্বর্গীয়। সেই অনুভূতি্র প্রকাশের জন্য শব্দপ্লাবন কম বলে হয়। একজন নারীই জানে এই অনুভূতির আসল রঙ। প্রসব যন্ত্রণা সহ্য করেও একটা প্রাণকে পৃথিবীর আলো দেখানোর যে অনুভূতি তা মায়েরাই জানেন। সব লড়াই , সব কান্না , সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয় ঐ একটা হাসি। যেসব দম্পতি সন্তানসুখ লাভ করেছেন তারা জানেন সন্তানের হাসিটার জন্য নিজেকে কতটা দূর নিয়ে যাওয়া যায়।  তবে যেসব দম্পতি সন্তানহীন থেকে যান, তারা তাদের কষ্ট জানেন।চরম নাস্তিকও বলতে বাধ্য হন, মা হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সবাই মা হতে পারেনা। তাই মাতৃত্বের পূর্ববর্তী গর্ভকালীন অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গর্ভাবস্থার খাওয়া দাওয়া – Diet for Pregnancy


গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধির দায় তার মায়েরই ।জরায়ুতে থাকাকালীন অবস্থায় শিশু তার মায়ের মাধ্যমে খাদ্যগ্রহণ করে থাকে। তাই গর্ভবতী মহিলার অতি পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা যায়। এই অবস্থায় গর্ভবতীদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। গর্ভবতী মহিলার যতটা দায়িত্ব তার আশেপাশের মানুষ গুলোর দায়িত্ব ঠিক ততটা্ই। তাই যত্নবান হওয়া সকলেরই প্রয়োজন। অনেকের মতে গর্ভবতী নারীদেরকে কম খাদ্য দেওয়া উচিত, যাতে সন্তান আকারে বড় না হয় এবং স্বাভাবিক ডেলিভারী সম্ভব। এটি মা ও সন্তান উভয়কেই ভবিষ্যত বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। আবার অনেকে মনে করেন যে গর্ভাবস্থায় একজনকে দুইজনের খাদ্য দেওয়া উচিত। সেটিও ঠিক নয়। একজন নারীর দৈনন্দিন ২১৬০ কিলোক্যালরি খাদ্য দরকারি, একজন গর্ভবতী নারীর জন্য সেই পরিমাপ ২৫১০ কিলো ক্যালরি খাদ্য দেওয়া উচিত।

এখন আসুন জেনে নেওয়া যাক গর্ভবতীদের জন্য সঠিক খাদ্য তালিকাতে ঠিক কি কি খাদ্য প্রয়োজন।

1. প্রোটিন –

প্রোটিন আমাদের শরীর গঠন এবং বৃদ্ধির জন্য একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। আমাদের উপমহাদেশীয় অঞ্চলে মহিলাদের দেহে প্রোটিনের অভাব লক্ষ্য করা যায়। গর্ভাবস্থায় এই চাহিদা বিপুল ভাবে লক্ষ্য করা যায়। কারণ শিশুর নতুন টিস্যু তৈরী করতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একজন গর্ভবতীর ৬০ গ্রাম প্রোটিনের প্রয়োজন। যাদের প্রোটিনের অভাব রয়েছে তাদের জন্য এক টুকরো মাছ, কমপক্ষে ৩- ৪ টুকরো মাংস প্রয়োজন। দৈনিক একটি ডিম, একগ্লাস উষ্ণ গরম দুধ প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে  প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় trimesterএ প্রতিদিন যথাক্রমে ১, ৯, ৩১ গ্রাম অতিরিক্ত প্রোটিন প্রয়োজন। তবে ডিম , মাংস কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যাবে না। এবং দুধ ভালো করে ফুটিয়ে খাওয়া উচিত।

2.ক্যালসিয়াম-

ক্যালসিয়াম আমাদের দেহের অন্যতম জরুরি একটি উপাদান। গর্ভাবস্থায় শেষ তিন মাস শিশুর হাড় এবং দাঁতের গঠন সম্পন্ন হয় । গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই ক্যালসিয়ামের চাহিদা থাকলেও শেষ তিনি মাস এর চাহিদা বেড়ে যায়। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার এক সমীক্ষাতে জানা গেছে গর্ভবতী মহিলার দৈনিক ক্যালসিয়ামের চাহিদা ১০০০ মিলিগ্রাম, কিন্তু শেষ তিন মাসে এই চাহিদার পরিমাপ হয় ১২০০ মিলিগ্রাম। তাই এই অবস্থায় দুগ্ধজাত দ্রব্য , দুধ, সবুজ শাক সব্জি, তৈলবীজ, কমলালেবু, এবং শুকনো ফল খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করা উচিত।

3. আয়রন –

আমাদের দেশের  অধিকাংশ মহিলা রক্তাল্পতায় ভোগেন। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে রক্তের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। আয়রন আমাদের শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, আমাদের দেহে শক্তির জোগান দেয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থায় শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে আয়রনের ভূমিকা অনস্বীকার্য । ইন্সটিউট অফ মেডিসিনের মতে দৈনিক ২৭ গ্রাম আয়রন মায়ের শরীরে প্রয়োজন হয়। এই কারণে রক্তাল্পতায় ভোগা মহিলাদের এই সময় আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়। এছাড়াও আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য যেমন ডিম ,মাছ, কচু শাক, পালং শাক জাতীয় খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

4.  ফোলিক অ্যাসিড :

কোষ বিভাজনে ফোলিক অ্যাসিডের বিরাট ভূমিকা থাকায় গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে ফোলিক অ্যাসিডের গুরুত্ব বেড়ে যায়। ফোলিক অ্যাসিড শিশুর মেরুদন্ড গঠনে সহায়তা করে। এই খাদ্যের অভাবে শিশুর জন্মগত মেরুদণ্ডের  ত্রুটি দেখা যায়। ফোলিক অ্যাসিডের ঘাটতির ফলে জন্মের সময় শিশুর শরীর সঠিকভাবে গঠিত হয় না।গর্ভকালীন অবস্থার প্রথম কয়েক মাস যেন মায়ের শরীরে ফোলিক অ্যাসিডের ঘাটতি না হয় তাহলে সেই ঘাটতি শিশুর উপর ভীষণ প্রভাব ফেলে। আই এম ও এর মতে গর্ভকালীন অবস্থায় একজন মায়ের দৈনিক ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফোলিক অ্যাসিডের প্রয়োজন হয়। এই সময় কমলালেবুর জুস,মুসুর ডাল, পালং শাক, পাউরুটি ইত্য্যাদি খাদ্যগ্রহণ উচিত।

5. ভিটামিন –

হাড় এবং অন্যান্য অঙ্গসমূহের গঠনের জন্য ভিটামিন এ অতি প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য। গর্ভস্থ শিশুর ড়োগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য, সার্বিক গঠনের জন্য ভিটামিন এ গুরুত্বপূর্ণ। WHO এর মতে দৈনিক আহারে একজন গর্ভবতী নারীর ৮০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন এ প্রয়োজন। শিশু এবং মা উভয়ের বিকাশের জন্য ভিটামিন এ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় গাজর, মুরগীর মাংস, আম, গাড় রঙের শাক সব্জি খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করা জরুরি।

6. ভিটামিন বি-১, বি-২, নিয়াসিন-

ভিটামিন বি পরিবারের মধ্যে যে ৬টি ভিটামিন আছে তার মধ্যে ভিটামিন বি-১, ভিটামিন-২, এবং নিয়াসিনের চাহিদা বেড়ে যায়। ভিটামিন বি ক্লান্তি দূর করে, দেহের পরিপাক ব্যবস্থাকে ঠিক রাখে। এছাড়াও চামড়ার শুষ্কতা দূর করে চামড়াকে সতেজ রাখে। গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোনের পরিবর্তনে গলা, পেট, কোমড়ের চামড়া স্ফীত হয়ে যায়। যার দরুন চামড়ার রঙ পাল্টে যায়। ভিটামিন বি সেই পরিবর্তন রোধ করে। রেড মিট, পালং শাক, ডিম, কলা , কাঠবাদাম, দুধ ইত্যাদি খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি থাকে।    

7. ভিটামিন সি –

ভিটামিন সি সহজেই খাদ্য থেকে আয়রন শোষণের মাধ্যমে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং দেহকে রক্তাল্পতার ভয় থেকে রক্ষা করে। সে কারণে আয়রন যুক্ত খাদ্য গ্রহণের পর লেবু জাতীয় ফল , যাতে ভিটামিন সি বেশি পরিমাণে থাকে সেইসব ফল খাওয়া খুবই উপকারী। ভিটামিন সি দেহে ফলিক অ্যাসিডকে কার্যকরী করে তলে।শিশুর বিকাশে কোলাজেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রোটিন।সেই প্রোটিন গঠনে  ভিটামিন সি এর ভূমিকা অসীম।লেবু আমলকি, পেয়ারা, কমলালেবু, বাতাবি লেবু, সবুজ শাক সব্জি ইত্যাদি খাদ্যে ভিটামিন সি থাকে।রান্না করলে এই ভিটামিনের গুণাগুন হ্রাস পায়। IOM এর মতে দৈনিক একজন গর্ভবতীর ৮৫ মিলিগ্রাম সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।

8. জিঙ্ক –

গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস জিঙ্ক একটি অত্যন্ত জরুরি উপাদান। জিঙ্ক গর্ভপাত রোধ করে, শিশুর ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। WHO এর মতে প্রত্যক গর্ভবতীর প্রথম তিন মাস ১১ মিলিগ্রাম দ্বিতীয় তিনমাস ১৪ মিলিগ্রাম এবং শেষের তিন মাস ২০ মিলিগ্রাম দৈনিক জিঙ্কের প্রয়োজন। জিঙ্ক পাওয়া যায় প্রধানত প্রানিজ প্রোটিনে, এছাড়াও চিনেবাদাম , কুমড়োর বীজ, গমের মধ্যে যা জিঙ্কের জপগান দেয়।

9. আয়োডিন-  

আয়োডিন শিশুর বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তাই আয়ডিনের অভাবে গর্ভাবস্থায় শিশুর ৩ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। আয়োডিনের অভাবে গর্ভে শিশু মৃত্যুর সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সামুদ্রিক মাছ, পনির, টক দই, দুধ, লবণের মাধ্যমে দেহে আয়োডিনের ঘাঁটতই দূর হয়। WHO এর মতে দৈনিক ২০০ মিলিগ্রাম আয়োডিনের প্রয়োজন একজন গর্ভবতীর।

10. DHA –

গর্ভের শিশু দৃষ্টিশক্তি এবং রক্তকোষের বিকাশে DHA উল্লেখ্য ভূমিকা নেয়। DHA হল ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড গুলির মধ্যে একটি।  শেষ তিন মাসে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে DHA এর ভূমিকা অপরিসীম। একজন গর্ভবতীর দৈনিক ২০০ গ্রাম করে DHA প্রয়োজন, এমনটাই WHO প্রয়োজন। সামুদ্রিক মাছ, ডিমে এই খাদ্য প্রয়োজন।

 


এছাড়াও ভিটামিন- ই, পটাশিয়াম, ভিটামিন ট্যাবলেট গর্ভবতীদের অবশ্য প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেশি পরিমাণে জল পান করা আবশ্যিক। জল শরীরে রক্তের তারল্যকে  বজায় রাখে এই রক্ত সঞ্চালনের দ্বারা শিশুর বিকাশ সম্পন্ন হয়।

তাই এই সকল খাদ্যগুলো গ্রহণ করুন, এবং নিজের শিশুকে সুস্থ রাখুন। ডাক্তারবাবুর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

 


Comments are closed.