ইন্দিরা গান্ধী রচনা – Indira Gandhi Essay

0

ভূমিকা

ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হলেন ইন্দিরা গান্ধী, এখনও পর্যন্ত একমাত্রও বটে। জনপ্রিয় নেহেরু পরিবারের কন্যা ইন্দিরা ভারতীয় রাজনীতির এক উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছিল অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা, রাজনৈতিক দুরদৃষ্টি।  

জন্ম ও বংশ পরিচয়

নেহেরু পরিবারের জওহরলাল নেহেরু ও কমলা নেহেরুর একমাত্র কন্যা ইন্দিরা নেহেরু ১৯১৭-এর ১৯শে নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। ইন্দিরার পিতা জওহরলাল নেহেরু সেইসময় একজন নামকরা আইনজীবি এবং তৎকালীন পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দলনের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। পিতামহ মোতিলাল নেহেরু ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন।  

শৈশব ও শিক্ষা

ছোটোবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বড় হয়েছেন ইন্দিরা। ছোটোবেলা থেকেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সমবয়সী কিছু ছেলেমেয়েকে নিয়ে ‘বানর সেনা’ বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই বাহিনীর কাজ ছিল বিপ্লবীদের খাবার জল দেওয়া, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

তাঁর শিক্ষা জীবন কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। পুনে ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করতে যান। শান্তিনিকেতনে রবি ঠাকুর তাঁর এই প্রিয় ছাত্রীর নাম ‘প্রিয়দর্শিনী’ রেখেছিলেন। তিনি সুইজারল্যান্ডে এবং লন্ডনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা নেন। ইন্দিরা সুইজারল্যান্ডে তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য ছিলেন। ১৯৩৬-এ তাঁর মা মারা যান।

বিবাহিত জীবন

অক্সফোর্ডে পড়াকালীন ইন্দিরার সাথে ফিরোজ গান্ধীর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। পার্সি পরিবারের যুবক ফিরোজ যুব কংগ্রেসের কর্মী ছিল। এর পাশাপাশি ফিরোজ একজন সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৪২-এ পিতার অমতে ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ে করে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহেরু হলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। পরে জওহরলাল নেহেরু তাদের মেনে নেন।

ইন্দিরা-ফিরোজের দুই পুত্রসন্তান হয়। রাজীব গান্ধী(১৯৪৪) ও সঞ্জয় গান্ধী(১৯৪৬)।

কর্ম ও রাজনৈতিক জীব

দেশে ফিরে ইন্দিরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯৩৮-এ ইন্দিরা কংগ্রেসে যোগদান করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হলে কন্যা ইন্দিরা তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৫৫-এ কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সমিতির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন ইন্দিরা। ১৯৫৯-এ তিনি পার্টির সভাপতির পদে নির্বাচিত হন।  

১৯৬৪তে ইন্দিরাকে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়। সেবছরই জওহরলাল নেহেরুর মৃত্যু হয়। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ইন্দিরাকে তথ্য ও সংষ্কৃতি দপ্তরের মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা

১৯৬৬তে শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর ব্যক্তিগত স্বার্থকে দলগত স্বার্থের নাম দিয়ে, সেই স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ইন্দিরা গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসে বুঝিয়ে দেন রাজনীতি তাঁর রক্তে এবং নিজস্ব গুণ দিয়ে তিনি সেই ক্ষমতা অর্জন করেছেন। অল্প দিনেই তিনি কংগ্রেসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী হয়ে উঠলেন।

রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ভাগ

রাজনীতির প্রথম ভাগে ১৯৬৬ থেকে ৭৭, টানা এগারো বছর তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশের আভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রাজনীতির উভয় দিক তিনি সামলেছেন। বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও তিনি নিয়েছেন। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থীদের আশ্রয়দানে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তিকে যুদ্ধে বিরত রাখার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি ইন্দিরার রাজনৈতিক দুরদৃষ্টি ও কূটনৈতিক চিন্তাধারার উদাহরণ। রাজনীতি জীবনে তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিল ছোটোছেলে সঞ্জয় গান্ধী।

তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার নামে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫-এ আভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এতে সাধারণ মানুষ বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় তাঁর ওপর। ফলস্বরূপ ১৯৭৭-এর নির্বাচনে হেরে যান তিনি। কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে জনতা দল। আগে থেকেই ইন্দিরার বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেইসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর জেল হয়।

রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় ভাগ

পরবর্তীতে কংগ্রেস(ই) পার্টি গড়ে ১৯৮০তে ফের ক্ষমতায় আসেন ইন্দিরা। কংগ্রেসকে ফের প্রতষ্ঠা করলেন। সেই বছরই তাঁর ছোট ছেলে সঞ্জয়ের বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তাঁকে নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড

১৯৮৪তে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখদের স্বর্ণমন্দিরে ‘অপারেশান ব্লু স্টার’ নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। ফলে শিখ সমাজ ইন্দিরা সরকারের প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ে। সেই বছরই ভারতীয় লোকসভার নির্বাচন যখন প্রায় নিকটে, ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিল্লীর বাসভবনে গুলি করে হত্যা করে তাঁর দুই শিখ দেহরক্ষী।

ইন্দিরা পরবর্তী রাজনীতি

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হন। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ও পুত্র রাহুল বর্তমানে জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম পরিচালক। অন্যদিকে সঞ্জয় গান্ধীর স্ত্রী মেনকা গান্ধী ও তাঁর পুত্র বরুণ বর্তমানে ভারতীয় জনতা দলের উল্লেকযগ্য পদে অধিষ্ঠিত।  

পুরস্কার ও সম্মাননা:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাদারস অ্যাওয়ার্ড(১৯৫৩), ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের হওলান পুরস্কার(১৯৬০), আন্তর্জাতিক সমঝোতার জন্য ইসাবেলা ডোসটে পুরস্কার(১৯৬৫), বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য লাভ করেন মেক্সিকান অ্যাকাডেমি পুরস্কার(১৯৭২), জাতিসংঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের দ্বিতীয় বাৎসরিক পুরস্কার (১৯৭৩), কূটনীতিতে বিচক্ষণতার জন্য ইতালির আইবেলা ডি এস্ট পুরস্কার পেয়েছেন ইন্দিরা। ২০১১-এ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরোণত্তর ‘স্বাধীনতা সম্মাননা’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৮ পরপর দু’বার ‘বিশ্বের সেরা নারী’ খেতাবে সম্মানিত হন ইন্দিরা গান্ধী। অর্জন  করেছেন ভারতরত্ন উপাধি।

গ্রন্থ

ব্যস্ততার মাঝে ইন্দিরা গান্ধী বেশ কিছু গ্রন্থ লিখেছিলেন। ‘দ্য ইয়ার্স অফ চ্যালেঞ্জ’, ’রিমেমামবার্ড মোমেন্টস’, ‘দ্য ইয়ার্স অফ এনডেভার’, ‘ইন্ডিয়া’ এবং ‘ইন্টারন্যাল ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি আরো বই লিখেছেন তিনি। বইগুলিতে তাঁর কর্মজীবন, চিন্তাধারা সম্বন্ধে জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তাঁর দেওয়া ভাষণ রয়েছে বই-য়ে।

উপসংহার

ক্ষুরধার রাজনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন ইন্দিরা ভারতীয় রাজনীতির সঞ্চালক ছিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে তিনি দেশ চালিয়েছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত শৌখিন মানুষ ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর পরে কোনো মহিলা এখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে বসেননি। তিনি ছিলেন ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম দিকপাল।

 লেখিকা – রুবি পাল 


Leave A Reply

Your email address will not be published.