কলকাতার নাইট লাইফ (Night Club)

কলকাতা মানেই গুরু-গম্ভীর ব্যাপার, কলকাতা মানেই রবীন্দ্র নাথ, গান, রাজনীতি আর যত রাজ্যের ভুরু কোঁচকানো ব্যাপার। ভাবখানা একেবারে আদ্যপান্ত সিরিয়াস। তা বলে এমন ধারনা রাখা ভুল যে এই শহর দিনের বেলা সাহিত্য কপচায় আর রাতের বেলা কেবল ঘুমিয়ে কাটায়। আপনি দিল্লী- মুম্বই এর তো কি হয়েছে, এই শহরেও আছে রাতের ঠিকানা। এই শহরে যারা নতুন বা যারা রাতের বেলার গন্তব্য হিসেবে কোথায় যাবেন বুঝতে পারছেননা তাদের জন্য আমরা দিচ্ছি কলকাতার এমন কিছু জায়গায় তালিকা যেখানে রাতের বেলায় জেগে ওঠে শহর।

কলকাতার নাইট লাইফ (Night Club)

উডস্টক হোক বা হার্ড রক বাঙালি এবং সমান ভাবে আছে। তাই নিশিযাপনে (kolkata night life) যে এই শহর পিছিয়ে থাকবেনা তা বলাই বাহুল্য। গান বাজনার ব্যাপারে কলকাতা ও কলকাতা বাসি বরাবরই বিশ্বের সঙ্গে সমানুপাতিক ভাবে এগিয়ে থেকেছে, রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে সাথে স্যান্টানা সবই আমাদের নখদর্পনে।  সপ্তাহান্তের রাত গুলো অনেকেই একটু অন্যরকম ভাবে কাটাতে চায়,  হল কলকাতার কিছু নামি ও পুরোনো ক্লাব, যেখানে গেলে আপনি পাবেন অসাধারন মিউজিক ও তার সাথে  আপনার সারা সপ্তাহের ক্লান্তি কে দূর করে দেবে।এমনই কিছু কলকাতার নাইট ক্লাবের কলকাতার নাইট লাইফ (night club in kolkata) কথা বলা হল এখানে।

1.  রক্সি (Roxy)

A post shared by ROXY (@roxy_thepark) on

কলকাতার সবথেকে পছন্দের পার্ক হোটেলের অন্তর্গত এই ক্লাব, যা শহরের একেবারে মধ্যিখানে এবং সবথেকে জনবহুল এলাকা পার্ক স্ট্রীট এ হওয়ার দরুন এখানে ভিড় হয় সবথেকে বেশি। এছাড়া সময় ও মুড অনুযায়ী অসাধারন মিউজিক আর এই ক্লাব এর পুরনো কলকাতা আর বিদেশি স্বাদের অন্দর সজ্জা এই ক্লাব টিকে কলকাতার নিশাচরদের পছন্দের তালিকায় এনে দিয়েছে প্রথম সারিতে। তাছাড়া এখানকার ড্রিঙ্ক এর বিভিন্নতা ও লোভনীয় সাইড ডিশ আপনাকে এখানে আসতে বাধ্য করবে বারবার। কলকাতার নিশিযাপন যদি আপনি দেখতে চান এবং পেতে চান তিলোত্তমার স্বাদ তবে রক্সি আপনার জন্য দরজা খোলা রেখেছে।

  • কখন যাবেন- বিকেল ৫ঃ৩০ তা থেকে রাত ১২ঃ৩০ টা অব্দি খোলা। সাধারণত রাত ১০ টার পর থেকে ভিড় হতে থাকে। এছাড়া প্রত্যেক বৃহস্পতিবার এখানে “স্পেশাল লেডিস নাইট” হয়ে থাকে, যেখানে মহিলারা পান বিশেষ ছাড়।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দু জনের খরচ ২৫০০ টাকা।

2. শীশা বার স্টক এক্সচেঞ্জ (Sheesha Bar Stalk Exchange)

কলেজে পড়েন? কিম্বা সবে চাকরি শুরু করেছেন- মোট-মাট পকেটে টান, কিন্তু মনটা ক্লাব ক্লাব করছে। এইরকম আবস্থার জন্য সেরা জায়গা হল শীশা বার স্টক এক্সচেঞ্জ। ওয়েস্ট সাইড বিল্ডিং এর ৬ তলায় এই ক্লাব, সাধ্যের মধ্যে ড্রিঙ্ক, খাওয়ার ও তার সাথে এক দারুণ মিউজিকাল পরিবেশের জন্য কলকাতার উঠতি নিশাচরদের প্রথম পছন্দ শীশা।  আগে শুধু হুক্কা বার হিসেবে থাকলেও এখন এর ড্রিঙ্ক এর স্টক যে কোন দামি ক্লাব এর সমকক্ষ। এর ড্রিঙ্ক স্টক, সুন্দর ভাবে সাজানো ড্যান্স ফ্লোর, আর আরামদায়ক সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট ও লাইভ স্পোর্টস স্ক্রিনিং এর ব্যবস্থা একে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

  • কখন যাবেন- বিকেল ৩ টে থেকে রাত ১২ টা  অব্দি খোলা।
  • পকেট টান- দুজনের জন্য ড্রিঙ্ক সমেত খরচ প্রায় ১৫০০ টাকা।

3. তান্ত্রা (Tantra)

পার্ক হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে তান্ত্রা- অসাধারন মিউজিক, দুর্দান্ত লাইটিং, বিরাট ড্যান্স ফ্লোর, আর বিশাল ড্রিঙ্ক এর সম্ভার- সব মিলিয়ে কলকাতার নাইট লাইফের শেষ কথা হল- তান্ত্রা। এছাড়াও বিভিন্ন স্পেশাল নাইট, ড্রিঙ্কিং গেম, ইভেন্ট, শো, আর বিভিন্ন বিশেষ দিনের সেলিব্রেশন সব কিছুই অন্যান্য সমস্ত ক্লাবের থেকে আলাদা আর জনপ্রিয়। এখানে কলকাতার বিভিন্ন প্রথম সারির সেলিব্রিটি ও শিল্পী দেরও দেখা যায়। সাধারণত নিউ ইয়ার ইভেই এখানে সব থেকে বেশি ভিড় হয়। কলকাতার বুকে যদি একটুকরো টুমরোল্যান্ড পেতে চান তবে এই তারকা খচিত ক্লাব হল আপনার স্থান।

  • কখন যাবেন- সন্ধ্যে ৭ টা থেকে রাত ১২ টা অব্দি খোলা। এছাড়া প্রত্যেক বুধবার এখানে লেডিস নাইট, তাই সমস্ত মহিলাদের জন্য সীমাহীন ড্রিঙ্ক বিনামুল্যে সার্ভ করা হয়।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ প্রায় ৩৫০০ টাকা। তবে লেডিস নাইটে কাপল দের জন্য ৮০০ টাকা।

4. সামপ্লেস এলস (Somplace Else)

কলকাতায় রক ও ক্লাসিক মিউজিকপ্রেমি দের জন্য সেরা ঠিকানা পার্ক স্ট্রীট এর সামপ্লেস এল্স। পুরনো ব্রিটিশ ধাঁচে সাজানো এই পাব এর লাইভ মিউজিকের জন্য সব থেকে বিখ্যাত। এখানে দেশি-বিদেশী নানা ব্যান্ড ও শিল্পীরা আসেন। এখানকার আরামদায়ক সিটিং অ্যারেন্জমেন্ট আর সুন্দর পরিবেশন ব্যাবস্থার জন্য এই ক্লাব সমস্ত বয়সের মানুষের কাছেই বেশ পছন্দের। রোজকার কর্ম ব্যস্ততার পরে কিছুটা সময় নিজের সাথে বা পছন্দের মানুষের সাথে কাটানোর জন্য সামপ্লেস এলস হল আদর্শ জায়গা। লাইভ মিউজিক ও তার সাথে পছন্দের ড্রিঙ্ক নিয়ে এখানে কাটাতে পারেন এক নির্মল সন্ধ্যে।

  • কখন যাবেন-  বিকেল ৪ঃ৩০ টে থেকে রাত ২ টো আব্দি খোলা। এ ছাড়া বিকেল ৪ঃ৩০ টে থেকে রাত ৮ টা অব্দি পাওয়া যায় বিশেষ ছাড়।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দু’জনের খরচ প্রায় ২৪০০ টাকা।

5. নকটার্ন (Nocturn)

A post shared by NOCTURNE (@nocturnelivethenight) on

একেবারে নিউ এজ সাজগোজ, ইন্টিরিয়র দেখে মনে হতে পারে কোনো হিন্দি সিনেমার মধ্যে এসে পড়েছেন বুঝি। তার সাথে অসাধারন মিউজিক সিস্টেম, আর বিশাল ড্রিঙ্কের সম্ভার সব মিলিয়ে রাতের সৌন্দর্যকে আরও রঙিন করে তোলার সমস্ত ব্যবাস্থা আছে এখানে। তার সাথে অসাধারন সমস্ত চাইনিস ও কন্টিনেন্টাল ডিশ আরো বাড়িয়ে তোলে এই ক্লাবের জনপ্রিয়তা। তবে ১৮ বছরের নিচে এই ক্লাবে প্রবেশ নিষেধ।

  • কখন যাবেন- বিকেল ৬ টা থেকে রাত ১২ টা অব্দি খোলা। তবে প্রত্যেক বুধবার লেডিস নাইট হয়, এই দিনে সমস্ত মহিলারা কোন রকম এন্ট্রি ফি ছারাই ঢুকতে পারবেন ক্লাবে। আর প্রত্যেক দিন বিকেল ৬ টা থেকে রাত ৮ টা অব্দি চলে হ্যাপি আওয়ার, এই সময় পাওয়া যায় বিশেষ ছাড়।
  • পকেট টান-  ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ প্রায় ২০০০ টাকা।

6. প্রাইভি আলট্রা লাউঞ্জ (Privy Ultra Lounge)

কলকাতার সবথেকে জনপ্রিয় ক্লাবগুলির মধ্যে অন্যতম হল এই প্রাইভি আলট্রা লাউঞ্জ। ফোরাম মলের ভেতরে আবস্থিত এই ক্লাব অন্যান্য ক্লাবের থেকে পরিমাপে ছোট হলেও, বিনোদনের ক্ষেত্রে কোন ক্লাবের থেকে পেছিয়ে নেই। অসাধারন ডিসাইনের ড্যান্স ফ্লোর, নিউ এজ মিউজিক, আর মায়াবী আলোর পরিবেশ সব মিলিয়ে নিশাচরদের স্বর্গরাজ্য। নামের সাথে মিল রেখেই এখানকার পরিবেশে আছে একটা অদ্ভুত রহস্যময়তা যা এখানকার মানুষকে দেয় মধ্য রাতে এক কল্প জগতের অনুভুতি। বিভিন্ন ধরনের ডিশ, ককটেল, ড্রিঙ্ক তো আছেই এছাড়াও আছে নানান ফ্লেভার এর হুক্কা। এর সাথে ডিজের অসাধারন মিউজিক আপনাকে ড্যান্স ফ্লোরে যেতে বাধ্য করবে।

  • কখন যাবেন-  দুপুর ১২ টা থেকে রাত ১২ টা। এছাড়া দুপুর ১২ টা থেকে বিকেল ৫ টা অব্দি হ্যাপি আওয়ারে থাকে খাওয়ার ও ড্রিঙ্কের ওপর বিশেষ ছাড়।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ ১২০০ টাকা।

7. এম-ওয়াই-এক্স (MYX)

A post shared by Felix Huang (@djfelixofficial) on

অসাধারন মিউজিক, দুর্দান্ত ডেকর, অতুলনিয় ড্রিঙ্কের সম্ভার, আর জিভে জল আনা খাওয়ার সব মিলিয়ে বিনোদনের অন্য নাম হল  এম-ওয়াই-এক্স। এর অসাধারন খাওয়ার আর ড্রিঙ্ক এর জন্য ২০১৬ সালে টাইমস গ্রুপের তরফ থেকে বছরের সেরা নাইট ক্লাবের পুরস্কারও পায় এই ক্লাব। পরিবেশে একটা সাইকেডেলিক ভাব আর অসাধারন মিউজিকের জন্য এখানে যারা একবার বার আসে তারা আবার আসেন। এখানকার ড্যান্স ফ্লোরটিতে একসাথে প্রায় ৩০০ জন থাকতে পারেন। আর  ডিজে আপনার অনুরোধ মত গান ও বাজান, যার ফলে এটি আরও জনপ্রিয়। এখানকার অসাধারন সমস্ত মাছের পদ, আর  অসংখ্য ককটেল একবার চেখে দেখা বাধ্যতামূলক।

  • কখন যাবেন- সন্ধ্যে ৮ টা থেকে রাত ১২ টা অব্দি খোলা।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ প্রায় ২০০০ টাকা।

8. ক্লাব বুডয়র (Club Boudoire)

A post shared by Rohan roy (@hellmods_) on

কালো ও সোনালি রঙের অন্দরসজ্জায় সাজানো ক্লাব বুডয়র দৃশ্যতই একটি ম্যাজিকাল আনুভুতি দেয়। ২০১৭ সালে টাইমস গ্রুপের তরফ থেকে বেস্ট নাইট লাইফ পুরস্কার প্রাপ্ত এই ক্লাব বর্তমানে কলকাতার সবথেকে বড় ক্লাব, যার উৎপত্তি দুবাই শহরে। অসাধারন আলোকসজ্জা, বিশাল পানীয়ের সম্ভার, ও চিত্তাকর্ষক মিউজিক সব মিলিয়ে এখন তিলত্তমার রাতের ঠিকানা ক্লাব বুডয়র। এখানে ড্রিঙ্ক এর পর্যাপ্ত পছন্দ থাকলেও খাওয়ার এর দিকে একটু কম বিস্তৃতি, তবে একেবারে কম নয়, সন্ধ্যে বা রাতের পার্টি বা  আড্ডার জন্য বেশ ভাল। দারুন মিউজিক, দারুণ পরিবেশ আর পর্যাপ্ত ড্রিঙ্ক সব মিলিয়ে এক দারুণ সন্ধ্যের উপকরণ পাবেন ক্লাব বুডয়রে।

  • কখন যাবেন- সন্ধ্যে ৬ টা থেকে রাত ১২ টা অব্দি খোলা।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ ১৫০০ টাকা।

9. হোয়াটস ইন দ্য নেম (Whats In The Name)

কলকাতার সবথেকে জনপ্রিয় পার্ক স্ট্রীট এলাকায় হওয়া নতুন ক্লাব গুলির মধ্যে অন্যতম এই ক্লাব খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিল্ডিং এর দুটি তলা জুড়ে বিস্তৃত এই ক্লাব এর অনন্য মিউজিক অ্যারেন্জমেন্ট ও মাজাদার সমস্ত ড্রিঙ্কিং গেমের জন্য কলকাতার ক্লাব প্রেমিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মিনি ফুসবল, দুর্দান্ত সমস্ত ককটেল, শট ব্যাটেল,  বিয়ার পং ইত্যাদি বিভিন্ন রকম বিনোদনের জন্য অল্প বয়সীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • কখন যাবেন- দুপুর ২ঃ৩০ টে থেকে রাত ১১ঃ৪৫ অব্দি খোলা।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ ১৫০০ টাকা।

10. আন্ডার গ্রাউন্ড রিইঙ্কারনেটেড (Underground Reincarnated)

অসাধারন লাইটিং সাথে শরীরে তাল এনে দেওয়া মিউজিক, আর জিভে জল আনা উত্তর ভারতীয় আর চীনে খাওয়ারের সম্ভার, সব মিলিয়ে ইউ জি রিইনকারনেটেড কলকাতার যুবা ক্লাবপ্রেমি দের বেশ পছন্দের জায়গা। এলিডি ড্যান্স ফ্লোর, দারুণ মিউজিক আর লাইটিং সব মিলে আপনাকে ফ্লোরে গানের তালে পা মেলাতে বাধ্য করবে। আপনার পছন্দের গানের অনুরোধ করলে বাজানো হবে তাও। সব মিলিয়ে ক্লাবে আসা মানুষের চাহিদা খেয়াল রেখে সার্ভ করে ইউ জি রিইনকারনেটেড। আপনি যদি থাকেন নাচের মুডে, আর যেতে চান কোথাও অন্য রকম জায়গায়, তবে হোটেল হিন্দুস্থান ইন্টারন্যাশনালে অবস্থিত- ইউ জি রিইনকারনেটেড হল আপনার জায়গা।

  • কখন যাবেন- সন্ধ্যে ৭ টা থেকে রাত ১ টা।
  • পকেট টান- ড্রিঙ্ক সমেত দুজনের খরচ ২২০০ টাকা।

হতে পারে কলকাতার মলাট টা পুরনো ধাঁচের, হতে পারে আমরা এখনো দেড়শো বছর পুরনো কবিতা আবৃত্তি করি, তবে তিলত্তমাকে বোরিং বলা যায়না, আপনার মত এই শহেররও রাতের আর দিনের রুপ দুটি আলাদা আর দুটিই সুন্দর।

লেখক: পূজা বিশ্বাস।


Comments are closed.